বিজ্ঞাপন
শিশুদের সাথে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আচরণ কেমন ছিল? সিরাত এবং হাদিসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, নবীজি শিশুদের তাহনিক করিয়ে দিতেন। ‘তাহনিক’ শব্দটির সাথে কি আপনারা পরিচিত? নবজাতক শিশুকে কোনো বুজুর্গ বা বিজ্ঞ আলেম ও স্কলারের কাছে দোয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া এবং সেই আলেম নিজে খেজুর চিবিয়ে তাঁর লালা মিশ্রিত খেজুরের রস দোয়াসহ শিশুর মুখে গুজে দেওয়াকে তাহনিক বলা হয়।
আমি নিজেও বহু জায়গায় গিয়েছি, যেখানে অনেক মা-বাবা তাঁদের সন্তানকে নিয়ে আমাদের কাছে এসেছেন খেজুর নিয়ে। বিশ্বনবীর সুন্নাহ হিসেবে আমিও তা করে দিয়েছি। আল্লাহর রাসুলের (সা.) কাছেও সাহাবিরা নবজাতকদের নিয়ে আসতেন আর তিনি পরম মমতায় তাঁদের তাহনিক করে দিতেন।
মদিনায় যখন সাহাবিরা হিজরত করে এলেন, তখন প্রাথমিক অবস্থায় কোনো সাহাবির ঘরেই কোনো সন্তান জন্মগ্রহণ করছিল না। সেই সময় আল্লাহর রাসুলের (সা.) শ্যালিকা, আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর কন্যা ও আয়েশার (রা.) বড় বোন আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) সন্তানসম্ভবা অবস্থায় মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করলেন। তিনি কুবা নামক স্থানে আসার পরপরই একটি পুত্রসন্তান জন্ম দিলেন। সেই ফুটফুটে শিশুটি হলেন আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)।
তাঁর জন্মে মদিনার মুসলমানদের মাঝে আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল। কারণ তখন ইহুদিরা রটিয়েছিল যে মুসলমানদের ঘরে নাকি কোনো সন্তান হচ্ছে না। তাই আসমা (রা.) সন্তান প্রসব করার সাথে সাথে মুসলমানদের মাঝে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়।
আসমা (রা.) তাঁর সদ্যজাত সন্তান আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়েরকে কোলে নিয়ে প্রিয় নবীজির দরবারে এলেন এবং বললেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনি আমার সন্তানের জন্য একটু দোয়া করে দিন।’
আরও পড়ুন
‘না দেখেই আমাকে ভাই বলেছিলেন রাসুল (সা.)’ কেন বললেন আজহারী?
আল্লাহর রাসুল (সা.) একটি খেজুর চিবিয়ে নিজের বরকতময় লালা মিশ্রিত খেজুরের রস আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়েরের মুখের ভেতর দিয়ে দিলেন। এই কারণে আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) সব সময় গর্ব করে বলতেন, তার সন্তান আব্দুল্লাহর পাকস্থলীতে পৃথিবীর প্রথম যে খাবারটি প্রবেশ করেছিল, তা ছিল প্রিয় নবীর বরকতময় লালা মিশ্রিত খেজুরের রস।
আল্লাহর রাসুল (সা.) এভাবেই শিশুদের তাহনিক করতেন। আপনাদেরও সুযোগ হলে স্থানীয় যেসব আল্লাহওয়ালা আলেম ও ভালো স্কলার আছেন, তাঁদের কাছে সন্তানদের নিয়ে গিয়ে তাহনিক করাবেন।
নবীজি (সা.) শিশু সন্তানদের পরম আদরে কোলে তুলে নিতেন। হাদিসে এসেছে, অনেক শিশুকে তিনি কোলে নিয়েছেন আর সেই শিশু নবীজির জামায় প্রস্রাব করে দিয়েছে এমন ইনসিডেন্টও ঘটেছে।
তিনি শিশুদের আগে সালাম দিতেন। আমরা কি শিশুদের আগে সালাম দিই? ছোট বাচ্চারা যখন দেখে তাদের আব্বু-আম্মু বা বড়রা আগে সালাম দেয় না, তখন তারা শেখে না। কিন্তু আমরা আগে সালাম দিলে আমাদের দেখে দেখেই তারা ধীরে ধীরে সালামের ব্যাপারে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে।
প্রিয় নবীজি শিশুদের আগে সালাম দিতেন, গালে ও মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। সাহাবি জাবের ইবনে সামুরা (রা.) তাঁর শৈশবকালের স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, একবার মসজিদে নববীর পাশে তারা কিছু শিশু দাঁড়িয়ে ছিলেন। নবীজি (সা.) নামাজ শেষ করে বের হয়ে প্রতিটি বাচ্চার গালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।
তিনি বলেন, হাত বুলাতে বুলাতে যখন আমার পালা এলো, নবীজি (সা.) আমার গালে হাত স্পর্শ করতেই আমি এক অপূর্ব হিমশীতল পরশ অনুভব করলাম। মদিনার বাজারে যখন আতর ব্যবসায়ীরা আতরের বাক্স খুলত, সেখান থেকে যেমন চমৎকার সুবাস বের হতো, ঠিক তেমনই এক জান্নাতি সুগন্ধি পাচ্ছিলাম প্রিয় নবীজির হাত থেকে।
তাহলে আমরা দেখতে পাই, শিশুদের দেখলে তিনি মাথায় ও গালে হাত বুলিয়ে দিতেন, তাদের চুমু খেতেন এবং তাদের সাথে খুব আনন্দ ও খেলাধুলা করতেন।
হাদিসে এসেছে, নবীজি তাঁর ছোট ছোট চাচাতো ভাইদের এক সারিতে দাঁড় করিয়ে বলতেন, দেখি, কে দৌড়ে এসে আমাকে আগে ধরতে পারো! যে আগে আসতে পারবে, তাকে এই উপহার দেওয়া হবে।
শিশুরাও আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে কেউ নবীজির (সা.) বুকের ওপর এসে ঝাঁপিয়ে পড়ত, কেউ কাঁধে উঠত, আবার কেউ পিঠে উঠত। নবীজি (সা.) তাদের সাথে এই শিশুসুলভ খেলায় মেতে উঠতেন।
পাশাপাশি শিশুদের কোনো আচরণে ভুল দেখলে তিনি পরম মমতায় তা শুধরে দিতেন। সাহাবি ওমর ইবনে আবু সালামা (রা.) বলছেন, ছোটবেলায় তিনি একবার প্রিয় নবীজির কোলে বসে খাচ্ছিলেন। থালা থেকে তিনি এদিক-সেদিক থেকে টেনে টেনে খাবার নিচ্ছিলেন।
তখন আল্লাহর রাসুল (সা.) তাকে বললেন, তুমি বিসমিল্লাহ বলো, ডান হাতে খাও এবং তোমার সামনের অংশ থেকে খাওয়া শুরু করো।
ওমর ইবনে আবু সালামা (রা.) বলেন, বিশ্বনবী যখন তাকে খাওয়ার এই গাইডলাইন ও নিয়ম শিখিয়ে দিলেন, তারপর থেকে সারাটা জীবন তিনি এই সুন্নত পদ্ধতিতেই খাবার খেয়েছেন।
এভাবেই নবীজি (সা.) শিশুদের আদর করতেন, ভালোবাসতেন, মায়া-মমতায় জড়িয়ে রাখতেন এবং ভুল করলে পরম মমতায় শুধরে দিতেন। শিশুদের সাথে প্রিয় নবীজির এই আচরণ আমাদের সবার জন্য চিরন্তন অনুকরণীয় শিক্ষা।
সূত্র: মিজানুর রহমান আজহারীর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ
আরও পড়ুন
মিজানুর রহমান আজহারী / অমুসলিম দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের বিধান
ওএফএফ
বিজ্ঞাপন