বিজ্ঞাপন
বিমা খাতে তথ্য গোপন ও ‘ডাবল সার্ভার’ ব্যবহারের অভিযোগ তুলে তা বন্ধে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে ছয় সপ্তাহ সময় দিয়েছেন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন।
তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গোপন বা অতিরিক্ত সার্ভার সরিয়ে তথ্য ব্যবস্থাপনা একীভূত করতে হবে। তা না হলে কারও গ্যারেজ, বিছানার নিচে কিংবা অন্য কোথাও সার্ভার লুকানো থাকলেও তা খুঁজে বের করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরাম (আইআরএফ) আয়োজিত এক আবাসিক কর্মশালায় এসব কথা বলেন আইডিআরএ চেয়ারম্যান। বীমা খাতের তথ্যের স্বচ্ছতা, ডিজিটাল রূপান্তর, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, গ্রাহকের দাবি পরিশোধ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বয় নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেন তিনি।
মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, বিমা কোম্পানিগুলো আইডিআরএ-কে যে তথ্য দেয়, তা সবসময় প্রকৃত তথ্য নয়। বিশেষ করে লাইফ ও নন-লাইফ দুই খাতেই কোম্পানিগুলোর আলাদা সার্ভার থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ কারণে খাতটির প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে নিয়ন্ত্রকের কাছে পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকে না।
তিনি আরও বলেন, শুধু আর্থিক প্রতিবেদন দেখে বিমা খাতের প্রকৃত চিত্র বোঝা সম্ভব নয়। কোম্পানিগুলোকে প্রকৃত তথ্য দিতে হবে, আইডিআরএকে তথ্য সরবরাহের বিষয়ে আরও শক্তিশালী বিধান করতে হবে এবং গণমাধ্যমকেও তথ্য যাচাই করে প্রশ্ন তুলতে হবে।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, ২০২৬ সালে বসে ২০২৫ সালের অডিট রিপোর্ট পাওয়া গেলে সেটি দিয়ে কার্যকর তদারকি করা কঠিন। তার ওপর কোম্পানিগুলো যে তথ্য দিচ্ছে সেটিই যদি সঠিক না হয়, তাহলে দেড় বছর আগের তথ্য দেখে নিয়ন্ত্রকের পক্ষে বর্তমান ঝুঁকি শনাক্ত করা সম্ভব নয়।
ডিসেম্বরের মধ্যে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি
বিমা খাতে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি বা রিস্ক বেজড সুপারভিশন (আরবিএস) চালু করার কথা জানিয়ে মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে এ ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হবে। এর মাধ্যমে কোন কোম্পানি কী ধরনের তথ্য দিচ্ছে এবং কোথায় তথ্যের ঘাটতি রয়েছে, তা আরও কার্যকরভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রথম নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আইডিআরএ ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে।
ছয় সপ্তাহের আল্টিমেটাম
‘ডাবল সার্ভার’ প্রসঙ্গে আইডিআরএ চেয়ারম্যান জানান, তিনি এরই মধ্যে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) ও বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) কাছে চিঠি দিয়েছেন। যেসব কোম্পানির একাধিক বা গোপন সার্ভার রয়েছে, সেগুলো একীভূত করতে ছয় সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এটা তাদের জন্য আমার সতর্কবার্তা। যারা করবে না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিজের প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, কোথায় সার্ভার লুকিয়ে রাখা হয়েছে তা শনাক্ত করতে প্রযুক্তিগত অডিট করা আইডিআরএর জন্য কঠিন নয়। প্রয়োজনে দেশের যে কোনো জায়গা থেকে এসব সার্ভার শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর ও বিএসইসির সঙ্গে যৌথ অডিট
বিমা কোম্পানিগুলোর তথ্য গোপনের সুযোগ বন্ধে অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার কথা জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান।
আরও পড়ুন
সবজির দাম সামান্য কমলেও চিনি-তেল-আটা-ডিমে নাভিশ্বাস
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে ব্যাংক হিসাব শনাক্তকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের সঙ্গেও বৈঠক হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সঙ্গে যৌথ অডিটের পরিকল্পনা চলছে।
মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আলাদাভাবে চিঠি দেওয়া ও জবাব পাওয়ার পরিবর্তে এই সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। তাহলে কোনো একটি সংস্থার চেয়ারম্যান বা কর্মকর্তার পরিবর্তন হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় অব্যাহত থাকবে।
চার মাসের মধ্যে ইউনিক পলিসি আইডি
বিমা খাতের ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে পুরো খাতের জন্য একটি অভিন্ন ‘ইউনিক পলিসি আইডি’ চালুর কথা জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান। বর্তমানে প্রতিটি কোম্পানির নিজস্ব পলিসি নম্বর থাকলেও পুরো বীমা খাতের জন্য অভিন্ন কোনো পরিচয় নম্বর নেই।
তিনি বলেন, ব্যাংক হিসাব নম্বরের মতো পুরো বীমা খাতের জন্য একটি ইউনিক পলিসি আইডি চালু করা হচ্ছে। আইডিআরের দলগুলো এরই মধ্যে বিভিন্ন কোম্পানিতে গিয়ে আরবিএস ব্যবস্থা স্থাপন, প্রশিক্ষণ এবং ইউনিক পলিসি আইডি সিস্টেম চালুর কাজ করছে।
আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে পুরো খাতে এই ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। এর ফলে ভুয়া প্রিমিয়াম দেখানো বা একই ব্যবসার তথ্য আংশিকভাবে দেখানোর মতো অনিয়ম কমে আসবে বলে মনে করেন আইডিআরএ চেয়ারম্যান।
এলসি খোলার আগে আইডিআরের কভার নোট যাচাই
নন-লাইফ বিমা খাতে এলসি ব্যবস্থায়ও ডিজিটাল নজরদারি চালুর পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, ভবিষ্যতে আইডিআরএ থেকে দেওয়া ইউনিক কভার নোট আইডি ছাড়া কোনো ব্যাংক এলসি খুলতে পারবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক এলসি খোলার আগে আইডিআরের সিস্টেম থেকে কভার নোটটি যাচাই করবে।
এর ফলে প্রতিটি এলসির বিপরীতে সংশ্লিষ্ট বিমা ব্যবসার তথ্য আইডিআরের কাছে থাকবে এবং ব্যবসার প্রকৃত পরিমাণ গোপন করার সুযোগ কমবে বলে জানান তিনি।
গ্রাহকের টাকা পরিশোধ শুরু আগামী সপ্তাহে
বকেয়া দাবি পরিশোধে সংকটে থাকা কয়েকটি বিমা কোম্পানির সম্পদ বিক্রি ও অন্যান্য সম্পদ নগদায়ন করে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম আগামী সপ্তাহ থেকে শুরু হবে বলে জানান মীর নাদিয়া নিভিন।
তিনি বলেন, প্রথম ধাপে সাত-আটটি কোম্পানিকে নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এসব কোম্পানির জমি বিক্রি, ট্রেজারি বন্ড ও এফডিআরসহ বিভিন্ন সম্পদ তরলীকরণের মাধ্যমে পাওয়া অর্থ আইডিআরের তদারকিতে পৃথক ব্যাংক হিসাবে রাখা হয়েছে। সেই অর্থ থেকে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ শুরু হবে।
দাবি পরিশোধে ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট’ (এফআইএফও) পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে বলেও জানান তিনি। অর্থাৎ যে গ্রাহকের দাবি আগে এসেছে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তিনিই আগে অর্থ পাবেন।
চেয়ারম্যান বলেন, কোম্পানিগুলোর ব্যাংক হিসাবে আইডিআরের তদারকি ও নিরীক্ষকের উপস্থিতি থাকবে এবং কোম্পানিগুলোর সরাসরি অর্থ ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না। কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে পাওয়া গ্রাহকদের দাবির তালিকা নিরীক্ষকদের দিয়ে যাচাই করা হয়েছে।
ফারইস্ট দিয়ে শুরু, সম্পদ বিক্রি করে দাবি পরিশোধ
বকেয়া দাবি পরিশোধের ক্ষেত্রে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের কথা উল্লেখ করে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার দাবি পরিশোধ না করার বিষয় রয়েছে। এ কারণে নতুন প্রথমবর্ষের প্রিমিয়াম নেওয়া বন্ধ রাখা হয়েছে, তবে নবায়ন প্রিমিয়াম নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
আরও পড়ুন
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে কারখানা চলছে জেনারেটরে, ডিজেলের ‘নীরব ঘাটতি’
তিনি জানান, ফারইস্টের ফেনীর একটি জমি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ এবং কিছু বন্ড তরলীকরণের অর্থ গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে ব্যবহার করা হবে। প্রাথমিকভাবে কয়েকশ কোটি টাকা দিয়ে পরিশোধ কার্যক্রম শুরু হতে পারে। আরও কয়েকটি সম্পত্তি বিক্রির জন্য টেন্ডার দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো বিক্রি হলে সেই অর্থও পর্যায়ক্রমে গ্রাহকদের দেওয়া হবে।
এক প্রশ্নের উত্তরে মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, ফারইস্টের সব সম্পদ ও বন্ড তরলীকরণ করা হলে প্রায় এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাওয়া যেতে পারে। ওই অর্থ দিয়ে বড় একটি অংশের দাবি নিষ্পত্তির পর কোম্পানিটির ব্যবসার ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হবে।
ঘুস নিলে বা দিলে সরাসরি মামলা
আইডিআরএতে ঘুস লেনদেনের অভিযোগে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, কোনো বিমা কোম্পানি আইডিআরের কর্মকর্তাকে ঘুস দেওয়ার চেষ্টা করলে সতর্ক না করে সরাসরি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একইভাবে আইডিআরের কোনো কর্মকর্তা কোনো কোম্পানির কাছে ঘুস চাইলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। এমন কোনো প্রমাণ থাকলে সাংবাদিকদের তা সরাসরি তাকে জানানোর আহ্বান জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, দুর্নীতির ক্ষেত্রে বিমা কোম্পানি হোক বা আইডিআরের কর্মকর্তা- কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
১৫০ কর্মী দিয়ে ৮২ কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ
আইডিআরের জনবল সংকটের বিষয়টিও তুলে ধরেন মীর নাদিয়া নিভিন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যেখানে প্রায় ৭ হাজার কর্মী দিয়ে ব্যাংকিং খাত নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে আইডিআরএকে প্রায় ১৫০ জন জনবল দিয়ে ৮২টি বিমা কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে।
এছাড়া আইডিআরের আইনগত দুর্বলতাও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, ২০১০ সালের বিমা আইন এখন আর্থিক খাতের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সময়ের সঙ্গে আইন হালনাগাদ ও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
নিয়ন্ত্রকের নির্দেশ অমান্য করলে ব্যবসা কঠিন হবে
বিমা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অংশীদারের মতো কাজ করতে চান জানিয়ে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, নিয়ন্ত্রক হিসেবে কোম্পানিগুলোকে আইডিআরের নির্দেশনা মানতে হবে।
তিনি বলেন, কোনো কোম্পানি নিয়ন্ত্রকের নির্দেশনা না মানলে তাদের জন্য ব্যবসা করা কঠিন করে দেওয়া হবে। সামনে আইডিআরএকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রক হিসেবে দেখতে পাবেন।
মীর নাদিয়া নিভিন জানান, তার মূল দায়িত্ব হলো পলিসিহোল্ডারদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষা করা। বিমা খাতকে একটি শক্তিশালী আর্থিক খাতে পরিণত করতে হলে প্রথমে তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি বলে জানান তিনি।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বিমা খাতের প্রকৃত তথ্য তুলে ধরতে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণের পাশাপাশি সেগুলো প্রকৃত তথ্য কি না সেই প্রশ্নও সাংবাদিকদের করতে হবে। জনগণের কাছ থেকে পাওয়া বাস্তব চিত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে তুলে ধরলে সংস্কার কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।
এমএএস/কেএসআর
বিজ্ঞাপন