বিজ্ঞাপন
জনগণের সরকারি সেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে প্রতিটি সরকারি দপ্তরে সিটিজেন চার্টার থাকার কথা। কোন দপ্তর থেকে কী সেবা পাওয়া যাবে, কীভাবে আবেদন করতে হবে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কী কী লাগবে, সেবার জন্য নির্ধারিত ফি কত, কত সময়ের মধ্যে সেবা পাওয়ার কথা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে—এসব তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকার কথা এই চার্টারে। কিন্তু ময়মনসিংহের সরকারি দপ্তরগুলোর বাস্তব চিত্র বলছে, নাগরিকের এই মৌলিক তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার এখনো অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত।
ময়মনসিংহে জেলা প্রশাসন, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, গণপূর্ত বিভাগ, সড়ক বিভাগ, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, কাস্টমস-এক্সাইজ-ভ্যাট বিভাগ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, সমাজসেবা অধিদপ্তর, পাসপোর্ট অফিস, বিআরটিএ, ভূমি অফিস, হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অন্তত ৪০টি কার্যালয় রয়েছে। গত কয়েকদিনে সরেজমিন এসব কার্যালয়ের মধ্যে মাত্র আটটিতে সিটিজেন চার্টার দেখা গেছে।
আরও পড়ুন
জনপ্রতিনিধির অভাবে ভোগান্তিতে রাজশাহীর ৭২ ইউনিয়নের মানুষ
সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই চার্টার বেশিরভাগ অফিসে না থাকায় সরকারি সেবা নিতে গিয়ে নাগরিকদের পড়তে হচ্ছে ভোগান্তিতে। কোথায় আবেদন করতে হবে, কী কী কাগজপত্র লাগবে, সরকারি ফি কত কিংবা কতদিনের মধ্যে সেবা পাওয়ার কথা— এসব মৌলিক তথ্য জানতে অনেককেই নির্ভর করতে হচ্ছে অফিসের কর্মচারী, পরিচিত ব্যক্তি কিংবা দালালের ওপর।
‘সিটিজেন চার্টার কেবল একটি তথ্যবোর্ড নয়; এটি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের মধ্যে সেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির লিখিত প্রকাশ। এর মাধ্যমে একজন নাগরিক জানতে পারেন তার অধিকার, সেবা পাওয়ার শর্ত, নির্ধারিত সময় ও প্রতিকার চাওয়ার পদ্ধতি। অথচ অনেক সিটিজেন চার্টারেই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তার নাম, পদবি, ফোন নম্বর ও ই-মেইল উল্লেখ নেই’
শুধু চার্টার না থাকার বিষয়ই নয়, যেসব দপ্তরে সিটিজেন চার্টার পাওয়া গেছে, সেখানেও সবকিছু সন্তোষজনক নয়। কোথাও তা সাধারণ মানুষের দৃষ্টিগোচর নয়, আবার কোথাও চার্টারের ওপরই জমে আছে ময়লা-আবর্জনা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চার্টারে থাকা তথ্য অসম্পূর্ণ, হালনাগাদ নয় কিংবা অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় তথ্যও নেই।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সিটিজেন চার্টার কেবল একটি তথ্যবোর্ড নয়; এটি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের মধ্যে সেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির লিখিত প্রকাশ। এর মাধ্যমে একজন নাগরিক জানতে পারেন তার অধিকার, সেবা পাওয়ার শর্ত, নির্ধারিত সময় ও প্রতিকার চাওয়ার পদ্ধতি। অথচ অনেক সিটিজেন চার্টারেই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তার নাম, পদবি, ফোন নম্বর ও ই-মেইল উল্লেখ নেই।
ফলে একজন নাগরিক কোনো সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কার কাছে যাবেন, কতদিনের মধ্যে সেবা পাওয়ার কথা কিংবা সেবা না পেলে কোথায় অভিযোগ করবেন, এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পান না।
আরও পড়ুন
শহুরে ডেঙ্গুর থাবায় আক্রান্ত প্রত্যন্ত উত্তরাঞ্চল
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মন্ত্রণালয়/বিভাগ/দপ্তর/সংস্থার সেবা প্রদান প্রতিশ্রুতি (সিটিজেনস চার্টার) প্রণয়ন সংক্রান্ত নির্দেশিকা, ২০১৭ অনুযায়ী নাগরিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও অভ্যন্তরীণ—এ তিন ধরনের সেবার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি সেবার ক্ষেত্রে সেবার নাম, সেবা প্রদানের পদ্ধতি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রাপ্তিস্থান, সেবার মূল্য ও পরিশোধ পদ্ধতি, সেবা প্রদানের সময়সীমা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম, পদবি, ফোন নম্বর ও ই-মেইল উল্লেখ থাকার কথা। তবে ময়মনসিংহের বিভিন্ন সরকারি অফিস ঘুরে এই মৌলিক তথ্যের ব্যাপক ঘাটতি দেখা গেছে।
‘নির্দেশিকা অনুযায়ী কোনো নাগরিক সরকারি সেবা নিয়ে অসন্তুষ্ট হলে প্রথমে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন। এরপর অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তা, আপিল কর্মকর্তা এবং প্রয়োজন হলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সেলে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য ৩০ কার্যদিবস, আপিল কর্মকর্তার ক্ষেত্রে ২০ কার্যদিবস এবং পরবর্তী পর্যায়ে ৬০ কার্যদিবসের সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে’
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় সেবা নিতে আসা বাবুল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, একটি সরকারি সেবা নিতে গিয়ে তাকে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছে ঘুরতে হয়েছে। কোথায় আবেদন করতে হবে, কী কী কাগজপত্র প্রয়োজন কিংবা নির্ধারিত ফি কত—এসব বিষয়ে আগে থেকে পরিষ্কার কোনো তথ্য পাননি তিনি।
বাবুল হোসেন বলেন, ‘অফিসে সিটিজেন চার্টার স্পষ্ট ও দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শিত থাকলে সেবার প্রক্রিয়া বিষয়ে আগেই জানতে পারতাম। এতে সময় ও ভোগান্তি দুটোই অনেক কমে যেত।’
নগরীর সিনিয়র সিটিজেন আবুল হাসনাত বলেন, ‘সরকারি সেবার নিয়ম ও প্রক্রিয়া বিষয়ে জনগণকে অন্ধকারে রাখলে দালাল নির্ভরতা ও হয়রানি বাড়ে। অনিয়ম-দুর্নীতির সুযোগও তৈরি হয়। নাগরিক যদি না জানেন তার কাজের সরকারি খরচ কত, কতদিনে কাজ হওয়ার কথা কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কে, তাহলে সহজ একটি কাজ করতেও তাকে বিভিন্নজনের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়।’
আরও পড়ুন
সঙ্গী হারালে একাকী জীবন, বংশবৃদ্ধি থমকে হারিয়ে যাচ্ছে শকুন
ময়মনসিংহ কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগীয় কার্যালয়ে সিটিজেন চার্টার বিষয়ে জানতে চাইলে এক কর্মকর্তা বলেন, এ কার্যালয়ে কোনো সিটিজেন চার্টার নেই। তার দাবি, তাদের দপ্তরে সিটিজেন চার্টারের প্রয়োজনও নেই।
গুরুত্বপূর্ণ অফিসগুলোর মধ্যে ময়মনসিংহ পুলিশ সুপারের কার্যালয়, সড়ক ভবন ও গণপূর্ত বিভাগের কার্যালয়েও সিটিজেন চার্টার পাওয়া যায়নি। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেও সিটিজেন চার্টার বিষয়ে পর্যাপ্ত ধারণার ঘাটতি দেখা গেছে।
কথা হয় ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের ফ্রন্ট ডেস্কে কর্মরত কনস্টেবল হোসনে আরার সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, সিটিজেন চার্টার বা নাগরিক সেবার বিষয়ে তিনি অবগত নন। জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সিটিজেন চার্টার-সংক্রান্ত কোনো বোর্ড বা ব্যানারও তার নজরে পড়েনি।
চার্টারে ময়লার স্তূপ
যেসব অল্প কয়েকটি দপ্তরে সিটিজেন চার্টারের দেখা মিলেছে, সেখানেও চিত্র পুরোপুরি সন্তোষজনক নয়। কোথাও চার্টার সাধারণ মানুষের দৃষ্টির আড়ালে রাখা হয়েছে, আবার কোথাও চার্টারের ওপর জমে আছে ময়লার স্তূপ।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোনো নাগরিক সরকারি সেবা নিয়ে অসন্তুষ্ট হলে প্রথমে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন। এরপর অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তা, আপিল কর্মকর্তা এবং প্রয়োজন হলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সেলে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য ৩০ কার্যদিবস, আপিল কর্মকর্তার ক্ষেত্রে ২০ কার্যদিবস এবং পরবর্তী পর্যায়ে ৬০ কার্যদিবসের সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে।
ময়মনসিংহ মহানগর সুজনের (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদক আলী ইউসুফ জাগো নিউজকে বলেন, ‘সিটিজেন চার্টার কোনো দপ্তরের দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখার আনুষ্ঠানিক কাগজ নয়; এটি নাগরিকের অধিকার ও সরকারি সেবার জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। সিটিজেন চার্টার দৃশ্যমান, স্পষ্ট ও হালনাগাদ না থাকলে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা সম্পর্কে সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হন। এর ফলে একদিকে নাগরিকের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়, অন্যদিকে দুর্নীতি, অনিয়ম ও হয়রানির সুযোগ তৈরি হয়। তাই প্রতিটি সরকারি দপ্তরে সিটিজেন চার্টার যথাযথভাবে প্রদর্শন ও নিয়মিত হালনাগাদ করা জরুরি।’
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) ময়মনসিংহের সভাপতি শরীফুজ্জামান পরাগ। তিনি বলেন, ‘সরকারি দপ্তরে সিটিজেন চার্টার শুধু প্রদর্শন করলেই হবে না; এটি হতে হবে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার কার্যকর দলিল। ময়মনসিংহের সরকারি দপ্তরগুলোতে সিটিজেন চার্টার দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শনের পাশাপাশি নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। একই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদেরও এ বিষয়ে অবহিত করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।’
আরও পড়ুন
নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে চলবে দেশের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রেন
তিনি আরও বলেন, ‘চার্টারে কোন সেবা কত সময়ে পাওয়া যাবে, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে এবং সেবা নিয়ে কোনো অভিযোগ হলে কোথায় প্রতিকার পাওয়া যাবে—এসব তথ্য বাস্তবে কার্যকর করতে হবে। শুধু চার্টার প্রণয়ন করে দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখলে নাগরিকরা এর সুফল পাবেন না।’
তবে সিটিজেন চার্টার নিয়ে আশার কথা শুনিয়েছেন ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান। তিনি বলেন, ‘সিটিজেন চার্টার হলো নাগরিকদের সঙ্গে রাষ্ট্রের অলিখিত চুক্তি। প্রতিটি অফিসেই থাকার কথা। যেসব কার্যালয়ে সিটিজেন চার্টার নেই, তা মনিটরিং করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এসআর/এএসএম
বিজ্ঞাপন