বিজ্ঞাপন
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ আয়-ভিত্তিক পরম দারিদ্র্য নিরসনে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে এক অসামান্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিসংখ্যানিক দারিদ্র্য হ্রাসের সূচকের আড়ালে এক গভীর কাঠামোগত সংকট ঘনীভূত হচ্ছে—যা ”সুযোগের দারিদ্র্য” নামে অভিহিত। এটি কেবল আয়ের চরম ঘাটতি নয়; বরং এটি এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক অবস্থা, যেখানে সাধারণ নাগরিক প্রথাগত দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে অবস্থান করলেও মানসম্মত শিক্ষা, সম্মানজনক কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন, প্রযুক্তি, সামাজিক গতিশীলতা এবং পরিবেশগত নিরাপত্তার মতো জীবন রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তিগুলো থেকে মৌলিকভাবে বঞ্চিত থাকে। এ অবস্থায় ব্যক্তির ভবিষ্যৎ সামাজিক অবস্থান তার নিজস্ব মেধা, দক্ষতা বা শ্রমের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ধারিত হয় তার জন্মস্থান, পারিবারিক শ্রেণিকাঠামো, লিঙ্গ পরিচয় এবং সামাজিক পুঁজির ওপর।
সুযোগের দারিদ্র্য বোঝার জন্য উন্নয়ন দর্শনের তাত্ত্বিক কাঠামো বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের \'সক্ষমতা পদ্ধতি\' বা \'ক্যাপাবিলিটি অ্যাপ্রোচ\' অনুসরণে বলা যায়, প্রকৃত উন্নয়ন কেবল মানুষের আয় বাড়ানো নয়, বরং মানুষের জীবন পছন্দের স্বাধীনতা এবং অর্জিত সক্ষমতা বা \'ফাংশনিং\'-এর বিস্তার ঘটানো। অমর্ত্য সেনের মতে, দারিদ্র্য হলো মৌলিক সক্ষমতার চরম অবমাননা। যখন একজন মানুষ ভালো শিক্ষার অভাবে বিচারবুদ্ধিভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, বা স্বাস্থ্যসেবার অভাবে অকাল পঙ্গুত্ব বরণ করে, তখন সে সক্ষমতার দারিদ্র্যে পতিত হয়। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বোর্দিয়োর \'সামাজিক পুনরুৎপাদন তত্ত্ব\' বা \'সোশ্যাল রিপ্রোডাকশন থিওরি\' দিয়েও এই সংকট ব্যাখ্যা করা যায়। বোর্দিও দেখিয়েছেন, সমাজে বিদ্যমান অর্থনৈতিক পুঁজি, সাংস্কৃতিক পুঁজি এবং সামাজিক পুঁজি কীভাবে শ্রেণিকাঠামোকে প্রজন্মের পর প্রজন্মে অপরিবর্তিত রাখে। দরিদ্র পরিবারের সন্তান উচ্চ সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পুঁজির অভাবে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ লাভ করতে ব্যর্থ হয়। ফলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সুযোগের সমতা প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট নীতিগত হস্তক্ষেপ না থাকলে সুযোগের বৈষম্যই সামাজিকভাবে পুনরুৎপাদিত হতে থাকে।
বাংলাদেশের সার্বিক উত্তরোত্তর সাফল্য কেবল এতে নিহিত থাকবে না যে কত শতাংশ মানুষ প্রথাগত আয়ের দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করতে পারল; বরং তা নির্ধারিত হবে রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা দেশের কোটি কোটি সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে তাঁদের সম্ভাবনা উন্মোচনের জন্য ঠিক কতটা প্রকৃত, টেকসই ও সমতাভিত্তিক সুযোগের নিশ্চয়তা দিতে পারল তার ওপর।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক উপাত্ত ও বৈশ্বিক প্রতিবেদনগুলো এই তাত্ত্বিক কাঠামোর বাস্তবতা প্রমাণ করে। বিশ্বব্যাংকের \'বাংলাদেশ দারিদ্র্য ও সমতা মূল্যায়ন\' অনুযায়ী, দেশে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০১০ সালের ৩৭.১ শতাংশ থেকে কমে ২০২২ সালে ১৮.৭ শতাংশে এবং চরম দারিদ্র্য ১২.২ শতাংশ থেকে ৫.৬ শতাংশে নেমে এসেছিল। তবে এই অগ্রগতির গতি ২০১৬ সালের পর স্থবির হয়ে পড়ে এবং প্রবৃদ্ধির ধরন ক্রমশ বর্জনমুখী হতে থাকে। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৬ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ—যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ—যেকোনো আকস্মিক অর্থনৈতিক, সামাজিক বা পরিবেশগত ধাক্কায় পুনরায় দারিদ্র্যের অতলে তলিয়ে যাওয়ার তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছেন।
সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে এই ঝুঁকি আরও দৃশ্যমান। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে যে, জাতীয় দারিদ্র্য ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে আনুমানিক ২১.৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬ অর্থবছরেও দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮.৫ শতাংশের বেশি উচ্চসীমায় অবস্থান করায় এবং নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত মজুরি মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে। অর্থনীতির রাজনৈতিক তত্ত্বের আলোকে এটি স্পষ্ট করে যে, মুদ্রাস্ফীতি ও সুযোগের সংকোচন মূলত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর এক ধরনের অদৃশ্য পরোক্ষ কর চাপিয়ে দেয়, যা সম্পদকে অনুৎপাদনশীল উচ্চবিত্তের হাতে পুঞ্জীভূত করে।
একটি নিম্ন-আয়ের পরিবারে জন্ম নেওয়া শিশু এবং উচ্চ-বিত্ত পরিবারের শিশুর শুরুর অবস্থান কখনোই এক হয় না। এটি কেবল পারিবারিক আয়ের ব্যবধান নয়; বরং তা প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগের চরম বৈষম্য। পুষ্টিকর খাদ্য, প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশ, প্রাইভেট টিউটরিং, প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম, ইংরেজি ভাষার দক্ষতা এবং সামাজিক নেটওয়ার্কের যে অমূল্য সাংস্কৃতিক পুঁজি উচ্চবিত্ত শিশুরা স্বাভাবিকভাবে লাভ করে, নিম্নবিত্ত শিশুরা তার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকে। দুটি শিশু যখন তাদের কর্মক্ষম বয়সে গিয়ে পৌঁছায়, ততদিনে তাত্ত্বিক বিচারে তাদের \'সুযোগের অসমতা\' বা \'ইনইকুয়ালিটি অফ অপরচুনিটি\' এক অলঙ্ঘনীয় প্রাতিষ্ঠানিক প্রাচীরে পরিণত হয়।
শিক্ষাব্যবস্থা এই প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যকে সবচেয়ে তীব্রভাবে প্রতিফলিত করে। সুনির্দিষ্ট স্কুলে ভর্তির হার বাড়লেও \'শিক্ষার গুণগত সক্ষমতা\' তৈরিতে বাংলাদেশ মারাত্মক পিছিয়ে। জাতিসংঘের শিশু তহবিলের \'বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫\' অনুসারে, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে মাত্র ৫০.২ শতাংশের প্রাথমিক পঠন দক্ষতা এবং মাত্র ৩৯.২ শতাংশের প্রাথমিক গণনা দক্ষতা রয়েছে। মাত্র ৪৩.৯ শতাংশ শিক্ষার্থী উচ্চ-মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে। বিশ্বব্যাংকের \'লার্নিং পভার্টি ব্রিফ\' ইঙ্গিত দেয় যে, প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পরও ৫১ শতাংশ শিশু একটি সাধারণ বাক্য পড়ে বুঝতে পারেনা। এখানে \'সুযোগের অভাব\' শ্রেণিঘরের অবকাঠামোতে নয়, বরং গুণগত শিখন প্রক্রিয়ার ভেতরেই সক্রিয় রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী পল উইলিসের শিক্ষা ও শ্রমবাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গুণগত মানহীন গণশিক্ষা ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত শ্রমিকের সন্তানদের অনানুষ্ঠানিক শ্রমশ্রমিক হিসেবেই পুনরুৎপাদন করে, যেখানে সনদের আনুষ্ঠানিকতা থাকলেও প্রকৃত উৎপাদনশীল দক্ষতা অর্জিত হয় না।
ফলাফলস্বরূপ, শ্রমবাজারে উচ্চতর সনদপত্রের অর্থনৈতিক মূল্য আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। স্নাতক ডিগ্রিধারীদের বেকারত্বের হার বর্তমানে প্রায় ১৩.৫ শতাংশ—যা জাতীয় মোট বেকারত্বের হারের প্রায় তিনগুণ। অন্যদিকে, দেশের ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের আনুমানিক এক-তৃতীয়াংশ ‘নিট’ বা ‘নট ইন এডুকেশন, এমপ্লয়মেন্ট অর ট্রেনিং’ সীমার অন্তর্ভুক্ত—অর্থাৎ তারা কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা, চাকরি বা কারিগরি প্রশিক্ষণে নেই। এটি একটি পুরো প্রজন্মের কাঠামোগত বিচ্যুতি বা \'স্ট্রাকচারাল অ্যালিয়েনেশন\'। প্রতি বছর প্রায় ২২ লক্ষ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় মাত্র ১৪ লক্ষের মতো। অর্থাৎ প্রায় ৮ লক্ষ তরুণ প্রতি বছর কোনো প্রথাগত কাজের ক্ষেত্র খুঁজে পেতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, যারা কাজ পান তাদের প্রায় ৭০ শতাংশই নিম্ন মজুরির অনানুষ্ঠানিক ও কৃষি খাতের কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হন। অনানুষ্ঠানিক কাজ জীবনধারণের সাময়িক আশ্রয় দিলেও তা অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ায় না।
লিঙ্গভিত্তিক সুযোগের বৈষম্য এই সংকটকে আরও জটিল করে তোলে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্যমতে, তরুণীদের মধ্যে \'নিট\' বা কর্মহীনতার হার ২৭.১ শতাংশ, যা তরুণদের ১৬.২ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। বিশ্বব্যাংকের দারিদ্র্য সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে, প্রতি পাঁচজন তরুণীর মধ্যে একজন সরাসরি বেকার এবং প্রতি চারজন শিক্ষিত তরুণীর মধ্যে অন্তত একজনের কোনো প্রথাগত কাজই নেই। নারীদের সুযোগের এই সীমায়িত অবস্থাকে অর্থনীতিতে \'অবৈতনিক যত্ন-শ্রমের চাপ\' বা \'আনপেইড কেয়ার ওয়ার্ক\' এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার অভাবের আলোকেই ব্যাখ্যা করতে হবে। এটি কেবল শ্রমবাজারের ব্যর্থতা নয়; বরং এটি পিতৃতান্ত্রিক সমাজকাঠামোর নীতিগত প্রতিফলন। আর্থিক খাতের তথ্যেও এই বৈষম্য স্পষ্ট—বাংলাদেশ ব্যাংকের উপাত্ত অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের মাত্র ৪৩ শতাংশ আনুষ্ঠানিক আর্থিক পরিষেবা ব্যবহার করেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৬৩ শতাংশ। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের ব্যাপক বিকাশ সত্ত্বেও নারীদের সক্রিয় অ্যাকাউন্টের অনুপাত কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়েনি। বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ফাইন্ডেক্স ডেটাবেস ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে সামগ্রিক অ্যাকাউন্ট মালিকানা ৪৩ শতাংশে উন্নীত হলেও ১০ জনের মধ্যে ৭ জন নাগরিকের কোনো ব্যাংক কার্ড নেই, এবং ডিজিটাল অর্থনীতি মূলত পুরুষদের অনুকূলেই কেন্দ্রীভূত রয়েছে।
ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বৈষম্য সুযোগের দারিদ্র্যের আরেকটি বড় রূপকার। উচ্চমানসম্পন্ন শিক্ষা, বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষায়িত চাকরি ও ডিজিটাল পরিকাঠামো রাজধানী ঢাকা ও কয়েকটি প্রধান নগরকেন্দ্রে চরমভাবে ঘনীভূত। অমর্ত্য সেন যাকে \'স্থানভিত্তিক সক্ষমতার অভাব\' বলেছেন—গ্রামীণ বা জলবায়ু-আক্রান্ত প্রান্তিক অঞ্চলের শিশুরা তা জন্মসূত্রে বহন করে। তদুপরি, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এই ভৌগোলিক ব্যবধানকে বহু গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ২ কোটি শিশু বন্যা, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, খরা ও তীব্র তাপপ্রবাহের মতো মারাত্মক জলবায়ু ঝুঁকিতে রয়েছে। পরিবেশগত ঝুঁকি কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; জলবায়ু সম্পর্কিত পুঁজিবাদী ক্ষতির প্রতিক্রিয়া বহন করতে হয় সবচেয়ে দুর্বল শ্রেণিকে, যেখানে একটি মাত্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ একটি পরিবারের কয়েক প্রজন্মের সঞ্চয়, ফসল ও বাসস্থান ধ্বংস করে শিশুদের শিক্ষা বন্ধ করতে এবং শ্রমবাজারে সস্তা মজুরিতে ঠেলে দিতে বাধ্য করে।
এমতাবস্থায় রাষ্ট্রীয় সামাজিক সুরক্ষাবেষ্টনী দারিদ্র্যের অভিঘাত কমানোর অন্যতম প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ার হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ অর্থবছরের ব্যয় বিশ্লেষণ দেখায় যে, সরকারি পেনশন বাদে সরকার মোট ১৩৯টি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে জিডিপির মাত্র ১.৮ শতাংশ বরাদ্দ করেছে, যার সিংহভাগই গুটিকয়েক বৃহৎ প্রথাগত কর্মসূচিতে ব্যয় হয়। ফলে তরুণ, বেকার ও সামাজিক ঝুঁকিতে থাকা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর কাছে রাষ্ট্রীয় সহায়তা অপ্রতুল। এটি ডেনীস সমাজবিজ্ঞানী গোস্তা এস্পিং-অ্যান্ডারসনের \'ওয়েলফেয়ার স্টেট রেজিম\' তত্ত্ব স্মরণ করায়। বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এখনও একটি \'অবশিষ্ট কল্যাণমূলক মডেল\' বা \'রেসিডুয়াল ওয়েলফেয়ার মডেল\' হিসেবে কাজ করছে, যেখানে সার্বজনীন নিরাপত্তার বদলে চরম বিপদে সামান্য অনুদান দেওয়া হয়, যা সুযোগের বৈষম্য দূর করতে সক্ষম নয়।
ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রবর্তনের যুগে প্রবেশ করায় তথ্যের সুযোগ ও দক্ষতার বৈষম্য আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। জাতিসংঘের শিশু তহবিলের ২০২৫ সালের সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশে ৭২.১ শতাংশ পরিবারে ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেও ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের মাত্র ৪৮.৩ শতাংশ এবং ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মাত্র ৩৭.৬ শতাংশের সর্বনিম্ন ডিজিটাল দক্ষতা রয়েছে। প্রযুক্তিবিজ্ঞানী ম্যানুয়েল ক্যাস্টেলসের \'নেটওয়ার্ক সোসাইটি\' তত্ত্ব অনুযায়ী, তথ্যায়ন ও প্রযুক্তিতে যাদের অভিগম্যতা নেই, তারা আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও অর্থনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক প্রাতিষ্ঠানিক শ্রেণিতে (অফলাইন মার্জিনালাইজড) পরিণত হয়।
এই গভীর সংকট দূর করতে হলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সনাতন চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে এসে নীতিগত অগ্রাধিকারের তাত্ত্বিক পরিবর্তন প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রাক্কলনে বাংলাদেশের ২০২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ২০২৬ সালের জুলাইয়ের পূর্বাভাসে তা ৩.৭ শতাংশ ধরা হয়েছে। যদিও ২০২৭ অর্থবছরে এডিবি ৪.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা করছে, তবুও তারা দুর্বল রপ্তানি, শ্লথ বেসরকারি বিনিয়োগ, জ্বালানী সংকট এবং ব্যাংকিং খাতের অস্থিতিশীলতার কথা উল্লেখ করে ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে।
তত্ত্বীয় দিক থেকে বলা যায়, সামষ্টিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি একা দারিদ্র্য বা সুযোগের বৈষম্য নিরসন করতে পারে না, যদি না সেই প্রবৃদ্ধি \'অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি\' বা \'ইনক্লুসিভ গ্রোথ\' হিসেবে রূপ নেয়। অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য প্রাথমিক শিক্ষায় পাঠ ও গণিতের গুণগত মান নিশ্চিত করা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার সাথে বাজারের দূরদর্শী কারিগরি সমন্বয় ঘটানো, এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোগগুলোর বাণিজ্যিক আইনি জটিলতা নিরসন করা জরুরি। কারণ এই ক্ষুদ্র শিল্পগুলোই বৃহৎ নগরকেন্দ্রের বাইরে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রধান উৎস।
সুযোগের দারিদ্র্য নিরসন কেবল কোনো সাময়িক করুণা বা ত্রাণভিত্তিক নীতি হতে পারে না; এটি প্রগতিশীল রাষ্ট্রের পুনর্গঠন ও \'সামাজিক ন্যায়বিচারের\' মৌলিক প্রশ্ন। রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ জন রলসের \'ন্যায্যতার তত্ত্ব\' বা \'থিওরি অফ জাস্টিস\' অনুযায়ী, একটি ন্যায্য সমাজে প্রতিটি মানুষের জন্য জীবনের প্রাথমিক সুযোগগুলোর সমান বণ্টন নিশ্চিত করতে হয় এবং সামাজিক বৈষম্য কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তা সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সর্বোচ্চ উপকারে আসে।
বাংলাদেশের সার্বিক উত্তরোত্তর সাফল্য কেবল এতে নিহিত থাকবে না যে কত শতাংশ মানুষ প্রথাগত আয়ের দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করতে পারল; বরং তা নির্ধারিত হবে রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা দেশের কোটি কোটি সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে তাঁদের সম্ভাবনা উন্মোচনের জন্য ঠিক কতটা প্রকৃত, টেকসই ও সমতাভিত্তিক সুযোগের নিশ্চয়তা দিতে পারল তার ওপর।
লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী।
এইচআর/এএসএম
বিজ্ঞাপন