ব্রেকিং নিউজ
মার্কিন মুদ্রায় ট্রাম্পের মুখ, এক শতাব্দীতে এমন নজির নেই, আইন কী বলে ভারত প্রশ্নে বাংলাদেশের কৌশল কী হতে পারে ত্রয়োদশ সংসদে প্রথম দাপ্তরিক কাজ করলেন মির্জা আব্বাস সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনে পুলিশকে রাষ্ট্রপতির আহ্বান বয়সের ফারাক অনেক, এমন দম্পতিদের ভালোবাসা নিয়ে বোঝাপড়া কতটা? ১৪তম গ্রেডের চাকরি, এক দশকে শতকোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ হাতকড়া পেলেও পালিয়ে যাওয়া আসামি ধরতে পারেনি পুলিশ শার্শায় পুলিশের অভিযানে ৪০ পিস ইয়াবা সহ ১ জন গ্রেপ্তার। মুঠোফোনের যুগে হারিয়ে যাওয়া জোনাকি আর জোছনার হারিয়ে যাওয়া শৈশব ঢাবি শিক্ষার্থীদের বৃত্তির জন্য এলিট গ্রুপের ২ কোটি টাকা অনুদান
জাতীয়

স্যানিটারি ন্যাপকিনের নাম না জানা গ্রামে বদলে গেছে চিত্র

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
কিশোরগঞ্জের নিকলীর দুর্গম একটি গ্রাম গোড়াদিঘা, নৌকাই যেখানে যাওয়ার একমাত্র বাহন। কিছুদিন আগেও সেখানে গেলে মনে হতো যেন আধুনিক সভ্যতার বাইরের কোনো জায়গা। সেখানকার বেশিরভাগ নারী কোনোদিন স্যানিটারি ন্যাপকিনের নামই শোনেনি, ব্যবহার তো অনেক দূরের কথা। গোড়াদিঘায় গুটিকয়েক ফার্মেসি। ফার্মেসির কর্মীরাও অনেকে জানতেন না স্যানিটারি ন্যাপকিন সম্পর্কে। পিরিয়ডে অনিরাপদ কাপড়-তুলা ব্যবহারের ফলে গোড়াদিঘার মেয়েরা ভুগতেন নানা অসুখে। তারা এটাকে অদৃষ্ট মনে করলেও এটা মানবসৃষ্ট। এটা সচেতনতার অভাব। ইনফেকশন, জরায়ু ক্যানসার, বন্ধ্যাত্বের মতো রোগে ভুগেছে এখানকার অনেক নারী। একরকম জনবিচ্ছিন্ন, সভ্যতার আলো থেকে বঞ্চিত মেয়েদের জন্যই শুরু হয়েছিল সান কমিউনিকেশনস লিমিটেডের পরিকল্পনায় ওএনজেড সলিউশনসের সহযোগিতায় এবং স্টেসেইফ স্যানিটারি ন্যাপকিনের উদ্যোগে ‘নিরাপদ পিরিয়ড, সবার অধিকার।’ নৌকা যেহেতু হাওরে যাতায়াতের একমাত্র বাহন, তাই নৌকাকেই কাজে লাগানো হয়। ঘোষণা করা হয় বিশেষ আনন্দ মেলার। গোড়াদিঘায় এই আনন্দ মেলা আয়োজনের উদ্দেশ্যে ছিল, গ্রামের সব নারীকে একটা জায়গায় একত্রিত করা। আর আনন্দ আয়োজনের মাধ্যমে সবাইকে নিরাপদ পিরিয়ড সম্পর্কে জানানো। নারীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে মেলা সংলগ্ন নদীর ঘাটে রাখা হয়েছিল স্টেসেইফের তিনটি বিশেষ নৌকা। যেখানে নারীরা পান পিরিয়ড নিয়ে চিকিৎসকের প্রয়োজনীয় পরামর্শ। এছাড়া নারীদের মধ্যে তিন মাসের ফ্রি স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ করা হয়। অল্প কয়েকটা ওষুধের দোকান আছে গোড়াদিঘায়। সেই দোকানগুলোর মালিক ও কর্মীদের পিরিয়ড ও প্যাড নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে স্টেসেইফ, যেন তারাও নিরাপদ পিরিয়ডের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানতে পারেন। এছাড়া ফার্মেসিতে ওষুধ কিনতে আসা সবার মধ্যে বিতরণ করা হয় বিশেষ সচেতনতামূলক ব্যাগ। মা-বাবাকে সচেতন করতে সেখানে লেখা হয়- ‘আপনার আদরের মেয়ে, কেন ভুগবে ক্যানসারে?’, ‘মাসিকের সময় পুরোনো ও অস্বাস্থ্যকর কাপড় তুলা ব্যবহার করলে হতে পারে জরায়ু ক্যানসার’, ‘মেয়েকে দিন স্যানিটারি ন্যাপকিন যেটা সাধ্যের মধ্যে, সেটাই নিন’। হাওরের পানিবন্দি নারীদের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম লুডু । তাই তো মেয়েদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল বিশেষ লুডু। সাপ লুডুতে সাপের মুখে লেখা হয় ‘বন্ধ্যাত্ব’, কোনোটায় ‘জরায়ু ক্যানসার’, কোনোটায় ‘ইনফেকশন’। এছাড়া বিভিন্ন মেসেজের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর পিরিয়ড সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করা হয়। গোড়াদিঘা গ্রামে একটিমাত্র স্কুল, সেখানেও মেয়েদের সচেতন করা হয় বিশেষ ক্লাসের মাধ্যমে। চলে উঠান বৈঠক আর পিরিয়ড নিয়ে মন খুলে আলোচনা। স্থায়ী সমাধানের জন্য গোড়াদিঘায় তৈরি করা হয় স্টেসেইফ গার্ল, যাদের কাছ থেকে মেয়েরা সহজে ফ্রি স্যানিটারি ন্যাপকিন নিতে পারবে। আর তিন মাস পর পাবে অর্ধেক দামে। এছাড়া ফার্মসিতেও রাখা হয় স্বল্প মূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনার সুযোগ। স্টেসেইফের হেড অফ মার্কেটিং নয়ন রায় বলেন, ‘এই সময়ে দাঁড়িয়ে কোনো গ্রামের মেয়েরা যদি স্যানিটারি ন্যাপকিন সম্পর্কে না-ই জানে, এটা শুধু একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, এটা সমান সুযোগ পাওয়ার পথেও বড় বাধা। আর এটাই আমরা মেনে নিতে পারিনি। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই স্টেসেইফ দাঁড়িয়েছে গোড়াদিঘার অসহায় নারীদের পাশে। আমাদের লক্ষ্য কেবল তাদের হাতে পণ্য তুলে দেওয়া নয়, বরং তাদের অভ্যাসে পরিবর্তন আনা। আমরা চেয়েছি এমন এক স্থায়ী সমাধান, যা নিশ্চিত করবে প্রতিটি মেয়ের পিরিয়ড হোক নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ।’ এই কাজের সঙ্গে সরাসরি জড়িত সান কমিউনিকেশনসের গ্রুপ কপি হেড রিয়াজুল আলম শাওন বলেন, ‘এই আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে একটা গ্রামের নারীরা স্যানিটারি ন্যাপকিনের নামই শোনেননি, চিন্তা করা যায়? রোগশোককে তারা মেনে নিয়েই কষ্ট পাচ্ছিল বছরের পর বছর। গোড়াদিঘার অসহায় এই মেয়েদের কথা জেনে কিছু করার তাড়না অনুভব করি। সান কমিউনিকেশনসের পরিকল্পনায় এবং ওএনজেড সলিউশনসের সহযোগিতায় স্টেসেইফকে সঙ্গে নিয়ে আমরা গোড়াদিঘার মেয়েদের জীবনে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছি। শুধু সাময়িক না, আমরা চেষ্টা করেছি স্থায়ী সমাধানের, যেন সব মেয়ের পিরিয়ড হয় নিরাপদ।’ সান কমিউনিকেশনসের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর তানভীর সিকদার বলেন, ‘যেখানে মেয়েরা এখন বিশ্বজয় করছে, সেখানে গোড়াদিঘার মেয়েরা কী অসহায় অবস্থায় আছে। আমরা খুবই সততার সঙ্গে কাজটা করার চেষ্টা করেছি, যেন ওখানকার নারীরা ভালো থাকেন। স্টেসেইফকে ধন্যবাদ এমন একটা কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য।’ স্টেসেফের উদ্যোগের কয়েক মাস পরে কী অবস্থা? গোড়াদিঘার পরিবর্তনটি শুধু স্যানিটারি প্যাড ব্যবহারের পরিবর্তন নয়। এটি একটি দুর্গম হাওর জনপদের নারীদের চিন্তা ও অভ্যাস বদলে যাওয়ার গল্প। যে জনপদে কয়েক বছর আগেও পিরিয়ডের সময় কাপড় ব্যবহার করতেন অনেকে, এখন সেখানে নারীরা প্যাড ব্যবহার করছেন। যে পণ্য একসময় সহজে পাওয়া যেত না, সেটি এখন স্থানীয় ফার্মেসিতে পাওয়া যাচ্ছে। যে বিষয় নিয়ে কথা বলতে সংকোচ ছিল, সেটি নিয়ে এখন স্কুলে, উঠানে, নৌকায় এমনকি খেলতে খেলতেও আলোচনা হচ্ছে। স্কুল শিক্ষার্থী ইসমা বলে, ‘আগে আমরা এসব বিষয়ে জানতাম না। স্টেসেফ মেলার মাধ্যমে এসব বিষয়ে আমাদের সচেতন করেছে। আমরা সবাই এখন এসব বিষয়ে সচেতন।’ তৃপ্তি আক্তার বলে, ‘স্টেসেফের মাধ্যমে শুধু আমি একা নই, আমাদের এলাকার প্রত্যেকে স্যানিটারি প্যাড সম্পর্কে জানতে পেরেছে এবং এখানকার সব নারী এখন প্যাড ব্যবহার করে।’ কাজেফা আক্তার নামে অপর এক ছাত্রী বলে, ‘আগে আমরা কাপড় ব্যবহার করতাম। এখন স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে আমরা সচেতন। আমরা এখন কাপড় ব্যবহার করি না। পিরিয়ডে প্যাড ব্যবহার করি।’  স্থানীয় ইউনিয়নের পরিষদের (ইউপি) সদস্য মো. আবদুল মোতালিব বলেন, ‘এই জনপদের নারীরা আগে সচেতন ছিলেন না। এখন চিত্র পাল্টে গেছে। এখন সবাই সচেতন। এই পরিবর্তনের পেছনে স্টেসেফের ধারাবাহিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও প্যাড সহজলভ্য করার উদ্যোগ বড় ভূমিকা রেখেছে।’ পল্লি চিকিৎসক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বছর খানেক আগেও এখানকার নারীরা পিরিয়ড এবং প্যাড ব্যবহার সম্পর্কে তেমন একটা জানতেন না। এখন অধিকাংশ নারীই সচেতন এবং তারা স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করেন।’ বর্তমানে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মেয়ে স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করছেন। বাবা-মায়েরা হয়েছেন সচেতন, তারা নিজেরা অনেকসময় মেয়েদের প্যাড কিনে দিচ্ছেন। বিভিন্ন জটিল রোগের প্রকোপ কমে এসেছে গোড়াদিঘায়। যে নতুন আলোয় আলোকিত হয়েছে গোড়াদিঘার মেয়েরা, সেই সচেতনতার আলো ছড়িয়ে পড়ুক সারা বাংলাদেশে। কারণ নিরাপদ পিরিয়ড সবার অধিকার। এমএমএআর
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>