বিজ্ঞাপন
কাস্টমসের সিপাহী আবু রায়হান তালুকদারকে ঘুমের ওষুধ পান করিয়ে নিজ ঘরে নৃশংসভাবে হত্যা করার পর ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বাড়ির কেয়ারটেকার রাজু মির্জা। পরের দিন ঘরের ভিতরে অতিরিক্ত সাউন্ডে গান বাজিয়ে মরদেহটি ১৫ টুকরো করেন তিনি। গভীর রাতে তার বন্ধুকে নিয়ে দেহাবশেষগুলো কাপড় পেঁচিয়ে তিনটি ট্রাভেল ব্যাগে ভরে বাড়ির পাশে জঙ্গলের ভিতরে একটি ডোবায় ফেলে রাখেন। মালিককে নির্মমভাবে হত্যা করার পরও নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে যান তারা। এরপর দুই দিন এলাকায় স্বাভাবিক চলাফেরা করছিল রাজু ও জিতুল। হত্যার পর মালিকের এটিএম কার্ড ব্যবহার করে টাকা উত্তোলন করে একটি আইফোন কিনে ঘাতক রাজু মির্জা।হত্যার ২৩ দিন পর গত মঙ্গলবার রাতে শ্রীমঙ্গল উপজেলার রেলস্টেশন এলাকা থেকে কেয়ারটেকার রাজু মির্জা ও তার বন্ধু জিতুল মির্জাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তা সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তারকৃত দুইজনকে ময়মনসিংহ আদালতে প্রেরণ করা হয়। বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট চতুর্থ বিচারিক আদালতের ১৬৪ ধারায় উভয় আসামী হত্যায় জড়িত থাকার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর তাদের কারাগারে প্রেরণ করেন বিচারক ইকবাল হোসেন।ফুলবাড়িয়া উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়নের সোয়াইতপুর গ্রামের মৃত আবু সিদ্দিকের কনিষ্ঠ ছেলে আবু রায়হান তালুকদার (৪৫) বাংলাদেশ কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট দপ্তর কমলাপুরে সিপাহী পদে কর্মরত ছিলেন। প্রায় পাঁচ বছর আগে তিন বছরের কন্যাসন্তানসহ তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যান। বাড়িতে অশীতিপর মা রাহেলা খাতুন, ডুপ্লেক্স বাড়ি, কৃষি জমিজমা দেখাশোনা করার জন্য অনন্তপুর গ্রামের স্কুলছাত্র রাজুকে কেয়ারটেকার হিসেবে রাখেন। রাজুর লেখাপড়াসহ সকল খরচ দিতেন তিনি। প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে রায়হান ঢাকার কর্মস্থল থেকে গ্রামের বাড়ি আসতেন ও রবিবার ভোরে চলে যেতেন।গত ২৩ জুলাই রাতে বাড়িতে আসেন রায়হান। পরের দিন আবু রায়হানকে বাড়িতে দেখতে না পেয়ে বড় ভাই নুরুল ইসলাম রাজুর কাছে তার সম্পর্কে জানতে চাইলে সে জানায়, মোটরসাইকেলে করে কাহালগাঁও বাজারে দিয়ে আসছে, সেখান থেকে একটি গাড়িতে করে ঢাকায় চলে গেছে। ২৬ জুলাই কর্মস্থলে না যাওয়ায় তার সহকর্মী নাজমুন্নাহার বিউটি বাড়িতে ফোন করে জানান, তিনি অফিসে আসেননি। পরের দিন তার বড় ভাই মো. নুরুল ইসলাম ফুলবাড়িয়া থানায় একটি নিখোঁজ সাধারণ ডায়েরি করেন। এরপর কেয়ারটেকার রাজু মির্জা ও তার বন্ধু জিতুল মির্জা গ্রাম ছেড়ে পালান। সম্পর্কে তারা চাচা-ভাতিজা।২ আগস্ট আবু রায়হানের বাড়ির ৩০০ গজ পূর্বে একটি পরিত্যক্ত ডোবা থেকে তিনটি ট্রাভেল ব্যাগ থেকে কাপড়ে মোড়ানো রায়হানের দেহাবশেষ উদ্ধার করে পুলিশ। গত ৪ আগস্ট আবু রায়হানের বড় ভাই নুরুল ইসলাম ফুলবাড়িয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পার্শ্ববর্তী অনন্তপুর গ্রামের ফজলু মির্জার ছেলে রাজু মির্জা (২১) ও একই গ্রামের সুরুজ মির্জার ছেলে সোহেল মির্জা জিতুল (২০) সহ অজ্ঞাত আসামী করে একটি মামলা করেন।মামলা হওয়ার ২১ দিন পর গত মঙ্গলবার রাতে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার রেলস্টেশন থেকে ঘাতক রাজু ও জিতুলকে গ্রেপ্তার করেন মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তা সাব-ইন্সপেক্টর শুভ্র সাহা। পরের দিন বুধবার দুপুরে সহকারী পুলিশ সুপার এস.এম হাসান ইস্রাফীল, ওসি তদন্ত মশিউর রহমান আসামীদের নিয়ে ফুলবাড়িয়া উপজেলার সোয়াইতপুর উত্তরপাড়া গ্রামে অভিযান চালান। আসামীদের দেখিয়ে দেওয়া স্থান থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি চাপাতি, দুটি চাকু, একটি লোহার রড, রক্তমাখা পাঞ্জাবি, বালিশ, তোয়ালে, কাঠের গুঁড়ি উদ্ধার করেছেন।পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় চার বছর আগে সন্তানসহ স্ত্রী চলে যাওয়ার পর বৃদ্ধ মায়ের যত্ন নিতে, বাড়ি ও জমিজমা দেখার জন্য রাজুকে কেয়ারটেকার হিসেবে রাখেন আবু রায়হান। কেয়ারটেকার থাকার পাশাপাশি লেখাপড়া করে। সোয়াইতপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র। লেখাপড়ায় অনীহা, মাদক ও অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ে। ঘটনার এক সপ্তাহ আগে রায়হান রাজুকে শাসন করতে গিয়ে চড় থাপ্পর মারেন। এতে সে ক্ষুব্ধ হয়।গত ২৩ জুলাই কমলাপুর থেকে আবু রায়হান গ্রামের বাড়িতে আসার সময় পথিমধ্যে থেকে মোটরসাইকেলে করে বাড়িতে নিয়ে আসে রাজু। রাতে দু’জনে একই রুমে ঘুমায়। পার্শ্ববর্তী বাজার থেকে জিতুল ঘুমের ওষুধ কিনে দেয় রাজুকে। দুধের মধ্যে ঘুমের ওষুধ সেবন করায় রায়হানকে। অচেতন হয়ে পড়লে নিজ ঘরে লোহার রড দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে নগদ অর্থসহ মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে যায়। ঘরের ভিতরে চাপাতি ও চাকু দিয়ে মরদেহটি হাত, পা, মস্তকসহ ১৫ টুকরো করে। এসময় অতিরিক্ত সাউন্ড দিয়ে গান বাজায়। গভীর রাতে রাজু ও জিতুল দু’জনে মিলে দেহাবশেষ কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে তিনটি ট্রাভেল ব্যাগে ভরে বাড়ির পাশে ডোবায় ফেলে রাখে। ঘটনাস্থলের রক্ত ও আলামত নষ্ট করতে ডিটারজেন্ট পাউডার, হ্যান্ডওয়াশ ও হারপিক দিয়ে ঘর ও বাথরুম পরিষ্কার করে। হত্যার কাজে ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো বাড়ির উত্তর পাশে বাউন্ডারি ওয়াল সংলগ্ন মাটির নিচে পুঁতে রাখে।হত্যার পর মালিকের এটিএম কার্ড ব্যবহার করে টাকা উত্তোলন করেন রাজু। সেই টাকায় বিলাসী চলাফেরা ও আইফোন ক্রয় করে। ময়মনসিংহ, ঢাকা, কক্সবাজার, সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাফেরা করে। মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলা সদরে রেলস্টেশন সংলগ্ন একটি বাসা ভাড়া নিয়ে দু’জনে বসবাস শুরু করে। সেখানকার একটি হোটেলে কাজ ঠিক করেন।তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন সহায়তার মাধ্যমে মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শুভ্র সাহা টানা চারদিন অভিযান চালিয়ে শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশের সহযোগীতায় শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশন এলাকা থেকে ঘাতক দুইজনকে গ্রেপ্তার। মামলার বাদী নুরুল ইসলাম বলেছেন, রাজুকে বাড়ির কেয়ারটেকার না, সহোদর ভাই মনে করতো রায়হান। টাকা পয়সা ও সম্পত্তির লোভে নৃশংসভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার সাথে দুইজন না আরও কেউ জড়িত থাকতে পারে। দ্রুত বিচার কার্যক্রম শেষ করে খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেখে যেতে চাই।ফুলবাড়িয়া থানার ওসি (তদন্ত) মশিউর রহমান জানিয়েছেন, রায়হান হত্যা মামলার প্রধান দুই আসামীকে শ্রীমঙ্গল উপজেলা রেলস্টেশন থেকে গ্রেপ্তার করে অভিযান চালিয়ে তাদের দেখিয়ে দেওয়ার স্থান থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার তাদের ময়মনসিংহ আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বাড়ির বিশ্বস্ত কেয়ারটেকার রাজু টাকার লোভে একাই হত্যা করেন। লাশ গুম করার জন্য বন্ধুর সহযোগিতা নেন। এখন পর্যন্ত এ দুজনের বাইরে আর কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল নিহত ব্যক্তির টাকা আত্মসাৎ। ঘটনার পরপর নিহত ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ (জব্দ) করে দেওয়া হয়। তাঁরা ব্যাংক কার্ড ও মোবাইল ব্যাংকিং থেকে বেশি পরিমাণ টাকা উত্তোলন করতে পারেননি। দুজন আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। পরে তাঁদের দুজনকে কারাগারে পাঠানো হয়।
বিজ্ঞাপন