বিজ্ঞাপন
প্রায় এক যুগ আগে ফ্রান্সে পাড়ি জমিয়েছিলেন সৈয়দ নাসির। কিন্তু দেশ ছাড়লেও ছাড়েননি অপরাধের পুরোনো নেশা। ডিবির দাবি, ইউরোপে বসেই দেশে একটি ডাকাতচক্র পরিচালনা করতেন তিনি।
ফ্রান্সে স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করছিলেন সৈয়দ নাসির। প্রায় এক যুগ আগে চুরি-ডাকাতির পুরোনো জীবন ছেড়ে ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছিলেন বাগেরহাটের এই ব্যক্তি। সময়ের সঙ্গে পুলিশের অপরাধী তালিকায় থাকা নামটিও অনেকটা আড়ালে চলে যায়। কিন্তু পুরোনো অভ্যাস থেকে বের হতে পারেননি তিনি। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবির) দাবি, ফ্রান্সে বসেই দেশে একটি ডাকাতচক্র পরিচালনা করছিলেন নাসির। চক্রের সদস্যরা মূলত স্বর্ণের দোকান টার্গেট করত। সর্বশেষ রাজধানীর মিরপুরের শাহআলী শপিং কমপ্লেক্সের দুটি জুয়েলারি দোকান থেকে প্রায় ২৫০ ভরি স্বর্ণালংকার লুটের ঘটনায় তদন্ত করতে গিয়ে আবারও সামনে আসে তার নাম।
ডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত সৈয়দ নাসিরসহ তার চক্রের ১১ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে নাসির জানিয়েছেন, বহু বছর ধরেই একটি দল পরিচালনা করে দেশের বিভিন্ন স্বর্ণের দোকানে চুরি-ডাকাতি করিয়ে আসছিলেন তিনি। ফ্রান্সে অবস্থান করলেও মাঝেমধ্যে দেশে এসে দলের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করতেন। বিভিন্ন দোকান কীভাবে টার্গেট করতে হবে, নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা কীভাবে বের করতে হবে—এসব বিষয়ে দিতেন পরামর্শ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সর্বশেষ গত এপ্রিল মাসে দেশে এসে শাহআলী মার্কেটের স্বর্ণের দোকানগুলো টার্গেট করেন নাসির।
জিজ্ঞাসাবাদে নাসির দাবি করেছেন, চুরি-ডাকাতি এখন তার কাছে এক ধরনের ‘নেশা’ হয়ে গেছে। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে স্বর্ণ লুট করাকে তিনি এক ধরনের ‘হিরোইজম’ হিসেবেও দেখতেন। বহু বছর ধরে এ কাজ করলেও এবারই প্রথম তিনি পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন বলে তদন্তকারীদের জানিয়েছেন।
ডিবি ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অপরাধ জগতে সৈয়দ নাসির ‘ফ্রান্স নাসির’ নামে পরিচিত। তার হয়ে দেশে চক্রটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন তার শ্যালক শামীম খান। ডিবির মিরপুর বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নাসিরের স্ত্রী পরবর্তীতে স্বামীর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে পারেন। তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরে তিনি অন্যত্র বিয়ে করেন। তবে শামীম খান দুলাভাইয়ের হয়ে দেশে চক্রটির কার্যক্রম সমন্বয় করে যাচ্ছিলেন।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, অপরাধজগতে দলটি ‘শ্যালক-দুলাভাই গ্রুপ’ নামেও পরিচিত। পরে শামীমকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ডিবির তদন্তে চক্রটির অপরাধের ধরন সম্পর্কেও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
তদন্তকারীরা বলছেন, কোনো মার্কেটকে টার্গেট করার পর সেখানে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে নিজেদের লোক নিয়োগ করত চক্রটি। এরপর ছদ্মবেশী ওই নিরাপত্তাকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে মার্কেট ও দোকানগুলো পর্যবেক্ষণ করত।
কোন দোকানে কত স্বর্ণ রয়েছে, কখন দোকান খোলা ও বন্ধ হয়, নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোথায় দুর্বলতা রয়েছে—এসব তথ্য সংগ্রহ করাই ছিল তাদের অন্যতম কাজ। পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়ার পর সুযোগ বুঝে চালানো হতো চুরির অভিযান। এ কারণে একটি অপারেশন সম্পন্ন করতে চক্রটি দীর্ঘ সময় নিত। তদন্তকারীদের ধারণা, নিরাপত্তাকর্মীর পরিচয় ব্যবহার করায় দীর্ঘদিন তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
ডিবির মিরপুর জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) সাজিদুর রহমান বলেন, শাহআলী মার্কেটের দুটি স্বর্ণের দোকানে লুটের ঘটনায় জড়িত ছয়জনই সৈয়দ নাসিরের দলের সদস্য। তারা ধানমন্ডিতে অবস্থিত ‘এভান্ট গ্রেড অ্যালায়েন্স লিমিটেড’ নামের একটি নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওই মার্কেটে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, লুট করা স্বর্ণের অর্ধেক চলে যেত চক্রের মূলহোতা সৈয়দ নাসির ও তার শ্যালক শামীম খানের কাছে। বাকি অংশ সদস্যদের ভূমিকা অনুযায়ী ভাগ করে দেওয়া হতো। নাসির ও শামীমের পাওয়া ৫০ শতাংশের মধ্যে নাসির পেতেন দুই ভাগ এবং শামীম এক ভাগ।
তদন্তকারীদের ভাষ্য, লুটের পরপরই স্বর্ণ বিক্রি করত না চক্রটি। বরং ঢাকাসহ আশপাশের জেলার বিভিন্ন স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছে স্বর্ণ বন্ধক রাখা হতো। পরিস্থিতি অনুকূলে এলে ধাপে ধাপে সেই স্বর্ণ ছাড়িয়ে নিয়ে বিক্রি করা হতো।
গত ২৫ জুলাই শাহআলী শপিং কমপ্লেক্সের দ্বিতীয় তলায় আল রাজ্জাক জুয়েলার্স ও এ হোসেন জুয়েলার্স থেকে প্রায় ২৫০ ভরি স্বর্ণালংকার লুট হয়। ঘটনার পর ডিবি ও থানা পুলিশ তদন্তে নামে। একপর্যায়ে কথিত নিরাপত্তাকর্মী নাসির উদ্দিন ওরফে ইউসুফ, সোহরাব হোসেন শিকদার ওরফে বাবুল, সাদেক ওরফে রাব্বি এবং আবুল কালাম মৃধাসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা ‘এভান্ট গ্রেড অ্যালায়েন্স লিমিটেড’-এর হয়ে মার্কেটটিতে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে মূলহোতা সৈয়দ নাসির, সমন্বয়ক শামীমসহ আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ডিবি সূত্র জানায়, ঘটনার পর মার্কেটে দায়িত্ব পালন করা ওই নিরাপত্তাকর্মীরা উধাও হয়ে যান। কর্মস্থলে জমা দেওয়া জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করতে গিয়ে তদন্তকারীরা দেখতে পান, সেগুলো ভুয়া। পরে তাদের গ্রেপ্তারের পর পরিচয় ও চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি বেরিয়ে আসে।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের দাবি, লুটের আগে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাকর্মীর ছদ্মবেশে দোকানগুলোর ওপর নজর রাখছিল চক্রটি।
এ হোসেন জুয়েলার্সের মালিক আবুল হোসেন বলেন, নিরাপত্তাকর্মীদের কয়েকজন বিভিন্ন সময়ে দোকানের দিকে উঁকিঝুঁকি দিতেন। তবে তখন তারা বিষয়টিকে স্বাভাবিক নিরাপত্তা তদারকির অংশ বলেই মনে করেছিলেন।
আবুল হোসেন জানান, ওই দুটি দোকানের পাশাপাশি মার্কেটের প্রিন্স জুয়েলার্সের তালাও ভাঙার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেখানে ঢুকতে পারেনি চক্রের সদস্যরা।
ডিবি মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) রাকিব খান বলেন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কাউকে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে নিয়োগের আগে জাতীয় পরিচয়পত্রসহ পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা জরুরি।
তার ভাষ্য, ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করে কেউ অপরাধ ঘটিয়ে পালিয়ে গেলে তাকে শনাক্ত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়। তাই নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ও তাদের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
তদন্তকারীদের মতে, ফ্রান্সে বসে চক্র পরিচালনা এবং দেশে নিরাপত্তাকর্মীর ছদ্মবেশে সদস্যদের নিয়োগ—দুই স্তরের এই কৌশলই দীর্ঘদিন ধরে চক্রটিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়িয়ে চলতে সহায়তা করেছে।
বিজ্ঞাপন