বিজ্ঞাপন
বৈঠার ছন্দে ছুটছে একের পর এক নৌকা। মাঝিদের হুংকারে মুখর সুরমা নদী। দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি ছোট-বড় নৌকায় শুধু মানুষ আর মানুষ। ঢাক-ঢোলের বাদ্য, করতালি আর হর্ষধ্বনিতে মুহুর্তেই উৎসবের নগরীতে পরিণত হয় হাওরাঞ্চল। প্রথম বারের মতো ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচকে ঘিরে সুরমা নদীতে নামে যেন জনসমুদ্র।
কিশোরগঞ্জের ইটনায় প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে জমজমাট নৌকা বাইচ। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) উপজেলার ধনপুর বাজার সংলগ্ন ‘সুরমা’ নদীতে অনুষ্ঠিত হয় এই নৌকা বাইচ।
নৌকাবাইচে ১২টি দৌড়ের নৌকা অংশ নেয়। লক্ষাধিক উৎসূক জনতা সহস্রাধিক নৌকায় এবং সুরমার পাড়ে অবস্থান নিয়ে প্রতিযোগিতাটি উপভোগ করেন।
হাওরের জল যেন হয়ে ওঠে উৎসবের জল। বৈঠার শব্দ, গানের সুর আর হাজারো মানুষের চিৎকারে তৈরি হয় এক অনন্য দৃশ্য। এভাবেই ইটনার হাওরে ফিরে আসে বাংলার পুরোনো নৌকা বাইচের উন্মাদনা।
দুপুরে নৌকা বাইচ শুরু হলেও সকাল থেকেই মানুষ এসে জড়ো হন। কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা তো বটেই, পাশের নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলা থেকেও অনেকে ছুটে এসেছিলেন এই আয়োজন দেখতে। আয়োজকদের দাবি, বিকাল পর্যন্ত চলা এ আয়োজনে লাখো মানুষের সমাগম হয়।
হাওরবাসীর কাছে এ নৌকাবাইচ শুধু উৎসব নয়, এটি শৈশবের স্মৃতি, আবার কারও কাছে গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যের সঙ্গে পুনর্মিলনের দিন ছিল।
প্রতিযোগিতা শুরুর পর থেকেই বাড়তে থাকে উত্তেজনা। জয়ের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেন মাঝিরা। বৈঠার তালে তালে নৌকা যত এগিয়েছে, ততই বেড়েছে দুই পাড়ের দর্শকদের উচ্ছ্বাস। কেউ করতালি দিয়ে প্রিয় নৌকাকে উৎসাহ দিয়েছেন, আবার কেউ মোবাইল ফোনে ধারণ করেছেন প্রতিযোগিতার মুহূর্ত।
স্থানীয়রা জানান, কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে নৌকা বাইচের ইতিহাস প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো। এ উপলক্ষে হাওরাঞ্চলে তৈরি হতো উৎসবের আবহ। কালের বিবর্তনে গ্রামবাংলার অনেক লোকজ খেলা ও বিনোদনের মতো নৌকা বাইচও হারিয়ে যেতে বসেছে।
ইটনায় সর্বশেষ ৫০ বছর আগে নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে এবার ‘সুরমা’ নদীতে এ আয়োজন করা হয়।
হাওরের তিন উপজেলা ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলা নিয়ে গঠিত কিশোরগঞ্জ-৪ সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের উৎসাহে ধনপুর ইউনিয়নবাসী এবারের এই নৌকা বাইচের আয়োজন করেন। দুপুর ১২ টায় শুরু হয় নৌকা বাইচ।
এতে প্রধান অতিথি ছিলেন ফজলুর রহমান এমপি। এছাড়া বিশেষ অতিথি ছিলেন কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ ভিপি সোহেল, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী উম্মে কুলসুম রেখা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাখন চন্দ্র সূত্রধর, জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম রতন, ইটনা উপজেলা বিএনপির সভাপতি এস এম কামল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকুজ্জান ঠাকুর স্বপন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার ছিল সোনার হরিণ, দ্বিতীয় পুরস্কার রুপার ময়ূর এবং তৃতীয় পুরস্কার এলইডি টিভি। প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ী নৌকার মালিকদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রধান অতিথি সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান।
এডভোকেট ফজলুর রহমান বলেন, নৌকাবাইচ ভাটিবাংলার উৎসব। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলের উৎসব এটি। এই উৎসব এখন হারিয়ে যাচ্ছে। ৫০ বছর পর সুরমা নদীতে নৌকাবাইচ আয়োজন করা হয়েছে। এ আয়োজনের উদ্দেশ্য পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা। পাশাপাশি তরুণদের মাদক থেকে দূরে রেখে খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের সঙ্গে যুক্ত করাই আমাদের লক্ষ্য।
নৌকা বাইচ আয়োজক কমিটির সদস্য উপজেলা বিএনপির যুগ্মসাধারণ সম্পাদক সুমেশ চন্দ্র গোপ জানান, নৌকাবাইচ দেখতে সকাল থেকেই হাজার হাজার মানুষ সুরমা নদীর দুই পাড়ে নৌকা নিয়ে এসে ভিড় করেন। দুপুরে লোকসমাগম লাখ ছাড়িয়ে যায়।
দীর্ঘ প্রতিযোগিতা শেষে ১২টি নৌকার লড়াইয়ে প্রথম স্থান অর্জন করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরাইল থেকে আসা শাপলা বয়েজ ক্লাব। বিজয়ী দলের হাতে তুলে দেওয়া হয় প্রথম পুরস্কার ‘সোনার হরিণ’। দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী দল পায় ‘রূপার ময়ূর’ এবং তৃতীয় পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় এলইডি টিভি।
প্রথম আয়োজনেই সুরমা নদীতে হাজারো মানুষের এমন ঢল ও ব্যাপক উৎসাহে খুশি স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, প্রতিবছর নৌকা বাইচের মতো আয়োজন হলে হাওরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি ও গ্রামীণ খেলাধুলা নতুন প্রজন্মের কাছে আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।
বিজ্ঞাপন