ব্রেকিং নিউজ
সংসদ অধিবেশন ঘিরে ঢাকায় যেসব এলাকায় সভা-সমাবেশ-বিক্ষোভ নিষিদ্ধ নতুন অধিনায়ক আফগানিস্তানের, ভারতের বিপক্ষে টি-২০ দল ঘোষণা শিক্ষার্থীদের উপহারের ফ্রিজ বাসায় নিয়ে গেলেন বিভাগীয় প্রধান ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্য দ্রুত নীতিমালা: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ‘দিনে ১০ খুন, যেন ভাগ্যে লেখা’ চেলসিতে জাবির রোমাঞ্চকর সূচনা যন্ত্রের অতিরিক্ত ব্যবহারও মাদকাসক্তির মতো ভয়ংকর আসক্তি ১ সেপ্টেম্বর থেকে চাহিদামতো টাকা তুলতে পারবেন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকেরা, আমানতে ‘হেয়ারকাট’ নেই মাত্র দুই মিনিটের ব্যবধানে দুই ভূমিকম্প, কাঁপল কোস্টারিকা রংপুরে চারজনকে হত্যার মামলাটি থানা থেকে ডিবিতে হস্তান্তর
জাতীয়

প্রতীকী কবর, ভাস্কর্যসহ যা যা দেখা যাবে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে

P
Prothom Alo অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad

দুই বছর আগেও রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ১৭ একর জায়গার ওপর এই আবাসিক ভবনের নাম ছিল ‘গণভবন’। এটি ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন। ছাত্র–জনতার প্রবল আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দোর্দণ্ড প্রতাপশালী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বাসভবন ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। এর পরপরই হাজারো বিক্ষুব্ধ জনতা ভবনটিতে ঢুকে লন্ডভন্ড করে দেন। ভবনটি এখন ‘জুলাই ৩৬ গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’।

আজ বুধবার জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দিন সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই জাদুঘরের উদ্বোধন করেন। বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক ছুটি ও সরকারি ছুটির দিন ছাড়া এই জাদুঘর এখন থেকে প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য খোলা থাকবে।

উদ্বোধনের পর থেকেই জাদুঘরে প্রবেশের জন্য পশ্চিম প্রান্তের প্রধান প্রবেশপথে অপেক্ষা করছিলেন জুলাই যোদ্ধারা। তাঁরা এবং গণমাধ্যমকর্মীরা বেলা ২টা ১৫ মিনিটে প্রবেশ করতে পারবেন—এমন নোটিশ থাকলেও নির্ধারিত সময়ের পরেও গেট খোলা হচ্ছিল না। তখন শুরু হয় প্রবল বৃষ্টি। একটা পর্যায়ে বিকেল চারটার দিকে অপেক্ষমাণ জুলাই যোদ্ধারা স্লোগান দিয়ে মিছিল করে একরকম জোর করে দ্বার ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করেন।

ভেতরে প্রবেশ করলে লাল ইট বিছানো পথের পাশ দিয়ে যেতে যেতে দর্শকেরা দেখতে পাবেন নানা ধরনের ফলের গাছ। এর পাশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ‘গণতন্ত্রের পথে দীর্ঘ যাত্রা’ নামের এক দীর্ঘ প্যানেল। এতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে স্বাধীনতার পর থেকে দেশে গণতন্ত্র ও স্বৈরাচারের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের আবহ। আছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত জাতির আন্দোলন–সংগ্রামের চিত্রাবলি।

অভ্যুত্থানের সময় জনতার হাতে হওয়া ধ্বংসাবশেষ দেখছেন এক দর্শনার্থী

প্রতীকী কবর আর ভাস্কর্য

প্রধান ফটকসংলগ্ন পথের দক্ষিণ অংশে বিশালাকার সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ। এই মাঠের একটি অংশ জুড়ে তৈরি করা হয়েছে ‘জুলাই মেমোরিয়াল’। সাদা মার্বেল পাথর দিয়ে বৃত্তাকারে মেমোরিয়ালটি ঘিরে রাখা। পাথরের ওপরে উৎকীর্ণ হাজার হাজার শহীদের নাম। শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে খুন হওয়া প্রায় চার হাজার ব্যক্তির নাম লেখা আছে এখানে। ভেতরের স্থানটি সবুজ ঘাসে ছেয়ে থাকা সারি সারি কবরের মতো। সামনে বড় প্রস্তরফলকে লেখা ‘দেশপ্রেমীদের রক্ত খেয়ে বাঁচত যাহার সিংহাসন/ সব শহীদের দখলে আজ সেই খুনিটার আবাসন।’

মূল জাদুঘরের চারপাশজুড়ে থাকা সবুজ মাঠের বিভিন্ন স্থানে তৈরি করা হয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানের আলোড়ন সৃষ্টি করা বেশ কিছু ঘটনা অবলম্বনে ভাস্কর্য। এর মধ্যে আছে রিকশার ওপরে গুলিবিদ্ধ লাশ, পুলিশের সাঁজোয়া যানে ঝুলে থাকা আন্দোলনকারীর মৃতদেহ, সাইকেল চালিয়ে মিছিলে যাওয়া স্কুলছাত্রী—এমন অনেক ভাস্কর্য।

এ ছাড়া মাঠে আরও দেখা যাবে পিলখানা হত্যাকাণ্ড, জুলাইয়ের নারী যোদ্ধা, পুকুরের পাশ দিয়ে গুমের শিকার মানুষদের পড়ে থাকা মৃতদেহ, গুমের জন্য র‍্যাবসহ আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা, শাপলা চত্বরের হত্যা–নির্যাতনসহ অনেক ঘটনার স্মারক ভাস্কর্য।

‘আয়নাঘর’ নামে কুখ্যাত যেসব গোপন বন্দিশালায় গুমের শিকার মানুষদের আটক রাখা হতো, সেই আয়নাঘরের আদলে প্রতীকী আয়নাঘর তৈরি করা হয় মাঠের দক্ষিণ অংশে।

গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যবহৃত চেয়ার

নিচতলায় হত্যা ও দুর্নীতির গোপন নথি

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনটি করা হয়েছে মূল জাদুঘর। দোতলা এই ভবনে প্রবেশ করতে হবে উত্তর দিকের পথ দিয়ে। প্রথমেই দর্শকেরা এসে ঢুকবেন বেশ বড় আকারের একটি কক্ষে। মেঝের ঠিক মাঝখানে রাখা আছে কাচের বলের মতো দেখতে গ্লোব টিভির প্রদর্শনী। এতে অনবরত ভেসে উঠছে শেখ হাসিনা ও সহযোগীদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ভিডিও।

জাদুঘরে নিদর্শনগুলো কীভাবে সাজানা হয়েছে সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানালেন মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব। বললেন, মূল জাদুঘরের দোতলা ভবনের নিচতলায় মূলত গত দেড় দশকে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে জনগণের ওপর যে নির্যাতন, গুম, খুন চালানো হয়েছে; গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমনের নামে মানুষকে যেভাবে নিষ্পেষিত করা হয়েছে, সেসব তুলে ধরা হয়েছে। এখানে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যা, পিলখানায় বিডিআর হত্যার মতো বিষয়গুলোও আছে। আর আছে গণভবনে যেসব গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পাওয়া গিয়েছিল। সেখানে আছে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা, অবৈধভাবে প্লট বরাদ্দ, আর্থিক লুটপাটসহ অনেক দুর্নীতির প্রমাণের নথিপত্র। আছে লাল টেলিফোন রাখা টেবিল-চেয়ার।

শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম–খুন হওয়া ব্যক্তি এবং বিভিন্ন প্রতিবাদী কর্মসূচির সময় তোলা তাঁদের পরিবারে ছবিও স্থান পেয়েছে জাদুঘরে

ঘুরে দেখা গেল, ‘কল রুম’ নামে পরিচিত বড় যে ঘরটিতে শেখ হাসিনা বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তা বা দেশের বড় বড় কর্মকর্তা, তিন বাহিনীর প্রধান প্রমুখ ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে নিয়ে সভা করতেন, সেই ঘরের মেঝে ঢেকে রাখা হয়েছে বিশেষ ধরনের পুরু কাচ দিয়ে। গণ–অভ্যুত্থানের দিন শেখ হাসিনা বাসভবন ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর সারা দিন হাজার হাজার মানুষ সীমানাপ্রাচীর ভেঙে গণভবনে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট করেন। সেই গণরোষের চিহ্ন রয়েছে ভবনের কক্ষগুলোর দেয়ালে। আর এই কক্ষের মেঝেটি অবিকৃত রাখতেই কাচ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। দর্শক এই কাচের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে পারবেন।

নিচতলায় অন্যান্য কক্ষে দেখতে পাবেন আয়নাঘরে যে বন্দীদের চাবুক দিয়ে পেটানো হতো, যে যন্ত্র দিয়ে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হতো, যে বৈদ্যুতিক চেয়ারে বসানো হতো—এমন অনেক রকম নির্যাতনের যন্ত্রপাতি। আরও আছে বিভিন্ন আন্দোলনের ভিডিও চিত্র, প্রামাণ্যচিত্র, সাক্ষাৎকার, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অনেক রকমের নিদর্শন।

শেখ হাসিনার ব্যবহৃত লাল ফোন নিয়ে বিভিন্ন বার্তা শুনছেন দর্শনার্থীরা।

হাসিনার বিছানায় শহীদের রক্তাক্ত শার্ট

দোতলাটি সাজানো হয়েছে জুলাই আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে। মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব জানালেন, এখানে অন্তত ৫০০ শহীদের ব্যবহৃত সামগ্রীসহ অনেক রকমের নিদর্শন রয়েছে। আরও অনেক নিদর্শন জুলাই জাদুঘরের সংগ্রহে রয়েছে। এখনো সংগ্রহ চলছে। স্থান সংকুলান না হওয়ায় সব নিদর্শন একসঙ্গে প্রদর্শন করা যাচ্ছে না।

দোতলায় শেখ হাসিনার প্রশস্ত শয়নকক্ষটি বিক্ষুব্ধ জনতা ভাঙচুর করেছিলেন। তাঁর বিছানায় শহীদের নাম লেখা একটি আচ্ছাদন পেতে রাখা। তার ওপরে বিছিয়ে রাখা হয়েছে শহীদ আবু ইসাহাকের রক্তমাখা শার্ট, গেঞ্জি, প্যান্ট। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলেই লম্বা একটি প্যাসেজের মতো জায়গা। সেখানে আছে জুলাই আন্দোলনের টাইমলাইন। এতে প্রতিদিনের ঘটনার বিবরণের সঙ্গে আছে আলোকচিত্র, ভিডিও, চিত্রকর্মসহ অনেক নিদর্শন।

গণ-অভ্যুত্থানের সময় তোলা ছবি ও ভিডিও দিয়ে তৈরি থ্রিডি অ্যানিমেশন দেখছেন দর্শনার্থীরা।

দোতলায় ‘ইমার্সিভ প্রজেক্ট’ নামে একটি কক্ষের চার দেয়ালজুড়ে ছাদ থেকে মেঝে পর্যন্ত ডিজিটাল পর্দা। সেখানে ৩৬০ ডিগ্রি কোণ থেকে ১০টি প্রজেক্টরে প্রদর্শিত হচ্ছে জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন দৃশ্য। মেঝেতে দর্শকদের বসার জন্য আসন পাতা। এখানে দৃশ্যগুলো দেখতে দেখতে দর্শকের এমন অনুভূতি হবে, যেন তিনি নিজেই পর্দার সেই ঘটনার ভেতরে প্রবেশ করেছেন।

একটি কক্ষে তৈরি করা হয়েছে মিছিলে উত্তাল রাজধানীর দৃশ্য। একটি কক্ষে আছে নারীশিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অংশগ্রহণের দৃশ্য। কোথাও কোথাও ছাদ থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে সূচিকর্মে আন্দোলনের দৃশ্যখচিত স্ক্রল। কোনো কোনো প্যাসেজে আছে আন্দোলনের দৃশ্যের চিত্রকর্ম, ডিজিটাল পোস্টার, ভাস্কর্যসহ হরেক রকমের নান্দনিক শিল্পকর্ম। কক্ষ, বারান্দা, প্যাসেজসহ বিভিন্ন স্থানে সাজিয়ে রাখা হয়েছে শহীদদের পোশাক, বই, খাতা, ক্রীড়াসামগ্রীসহ বিভিন্ন নিদর্শন।

জাদুঘরের দেয়ালে দেয়ালে গণ–অভ্যুত্থানের সময়কার স্লোগান।

কখন যাবেন

মূল জাদুঘরের জায়গাটি ছোট। একসঙ্গে অনেক দর্শক প্রবেশ করতে পারবেন না। সে কারণে তিনটি পর্বে দর্শকেরা যেন আসতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানালেন মহাপরিচালক।

বেলা ১১টা থেকে ১টা। আবার বেলা ১টা থেকে ৩টা। শেষ পর্ব বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা। এই সময়ের মধ্যে দর্শকেরা মূল জাদুঘরের নিদর্শন দেখতে পারবেন। তবে জাদুঘর থেকে বের হয়ে মাঠে যতক্ষণ ইচ্ছা ঘুরে বেড়ানো, পুকুরপাড়ে বসে বা ক্যাফেটেরিয়ায় আড্ডা দিয়ে সময় কাটাতে পারবেন। টিকিটের দাম বড়দের জন্য ৫০ আর শিশুদের জন্য ২০ টাকা। জুলাই ৩৬ স্মৃতি জাদুঘরের ওয়েবসাইটে গিয়ে অনলাইনে টিকিট কাটা যাবে। আবার সরাসরি জাদুঘরে গিয়েও টিকিট সংগ্রহ করা যাবে।

বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>