বিজ্ঞাপন
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলছে প্রধান শিক্ষক সংকট। জেলার ২৪১টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় ভারপ্রাপ্তদের দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম। এতে নিয়মিত দাপ্তরিক কাজ, শিক্ষক সমন্বয়, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা ও পাঠদানে তৈরি হচ্ছে নানা জটিলতা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, শুধু প্রধান শিক্ষকই নয়, জেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় রয়েছে আরও নানা ধরনের জনবল সংকট। ফলে ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম।
প্রধান শিক্ষক একটি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমের কেন্দ্রীয় দায়িত্বে থাকেন। শিক্ষক-কর্মচারীদের সমন্বয়, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন, দাপ্তরিক কাগজপত্রে স্বাক্ষর, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও ফলাফল পর্যালোচনা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হয় তাকে। কিন্তু বিপুলসংখ্যক বিদ্যালয়ে নিয়মিত প্রধান শিক্ষক না থাকায় এসব দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রে ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পড়ছে।
‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়ে। বিশেষ করে চরাঞ্চলে নজর দেওয়ার জন্য। এমনকি ক্লাস না করানোর অভিযোগে চরাঞ্চলের কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব পদে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।’
ফলে একজন সহকারী শিক্ষককে নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে। এতে একদিকে তার পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে সামলাতে হচ্ছে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজও। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকটের সঙ্গে প্রধান শিক্ষক সংকট যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের চেয়ার/ ছবি: জাগো নিউজ
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার টিকরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সামিমা আখতার। এক বছরের বেশি সময় ধরে বিদ্যালয়টির অতিক্তি দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। কারণ গত এক বছর আগেই অবসরে গেছেন এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।
সামিমা আখতার বলেন, এক বছরের বেশি সময় ধরে আমি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছি। নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজও করতে হচ্ছে। এতে কাজের চাপ অনেক বেড়ে গেছে। একজন সহকারী শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের পাশাপাশি প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করা বেশ কঠিন। অনেক সময় প্রশাসনিক কাজের কারণে পাঠদানেও ব্যাঘাত ঘটে। বিদ্যালয়ে দ্রুত একজন নিয়মিত প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলে শিক্ষার পরিবেশ ও দাপ্তরিক কার্যক্রম আরও সুন্দরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এমনকি ক্লাস নিতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
‘দীর্ঘদিন ধরে জেলার ২৪১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় এসব বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমে নানা ধরনের সমস্যা হচ্ছে। একজন সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে তাকে একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান এবং বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজ সামলাতে হচ্ছে। এতে শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে এবং অনেক সময় নিয়মিত পাঠদানেও বিঘ্ন ঘটছে।’
সহকারী শিক্ষক আমিরুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় আমাদের নানা সমস্যার মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করতে হয়। এতে অনেক সময় দাপ্তরিক কাজ সামলাতে গিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে বিঘ্ন ঘটে। প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনাতেও নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে। দ্রুত একজন প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েরই উপকার হবে।
এদিকে চরাঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নামমাত্র বেতনে স্থানীয় অল্পশিক্ষিত ব্যক্তিদের দিয়ে পাঠদানের ঘটনাও সামনে এসেছে। জেলার নারায়নপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস না করার অপরাধে চারজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। এই বিদ্যালয়েও প্রধান শিক্ষক নেই। এমনকি চরাঞ্চল হওয়ায় শিক্ষকরাও ক্লাসে আসেন না ঠিকমতো।
প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চর-আলাচুলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জহুরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নারায়নপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলিনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নয়াগোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, টিকরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নয়াগোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ২৪১টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। অন্যদিকে জেলায় মোট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭০৭টি।
সদর উপজেলার রেহাইচর এলাকার প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীর অভিভাবক রাকিমুল ইসলাম বলেন, প্রধান শিক্ষক না থাকায় অনেক বিদ্যালয়ে নিয়মিত তদারকির ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। বিদ্যালয়ের নানা সমস্যা নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, শিক্ষকদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন এবং অভিভাবকদের অভিযোগের সমাধানেও জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলামের ছেলে নয়াগোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, নয়াগোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক নেই। এতে বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রমে এক ধরনের নেতৃত্বের সংকট তৈরি হয়েছে। প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা, শিক্ষকদের মধ্যে সমন্বয় এবং দৈনন্দিন নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
আরও পড়ুন
পাবনায় প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ৫৪ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়
তিনি আরও বলেন, একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পদটি শূন্য থাকায় বিদ্যালয়ে সেই নেতৃত্ব ও তদারকির ঘাটতি রয়েছে। এতে শিক্ষকরা নিজেদের মতো করে দায়িত্ব পালন করলেও সার্বিকভাবে বিদ্যালয়ের কার্যক্রমে কাঙ্ক্ষিত গতি থাকছে না। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ ও মান নিয়েও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রফিকুল ইসলামের ভাষ্য, শুধু প্রশাসনিক কাজ নয়, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, শিক্ষকদের দায়িত্ব বণ্টন ও বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সমস্যা দ্রুত সমাধানের ক্ষেত্রেও প্রধান শিক্ষকের প্রয়োজন রয়েছে।
আরও পড়ুন
নড়াইলে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ৩২০ প্রাথমিক বিদ্যালয়
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জেলার ২৪১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় এসব বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমে নানা ধরনের সমস্যা হচ্ছে। একজন সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে তাকে একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান এবং বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজ সামলাতে হচ্ছে। এতে শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে এবং অনেক সময় নিয়মিত পাঠদানেও বিঘ্ন ঘটছে।
তিনি বলেন, প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রম বাস্তবায়ন, শিক্ষকদের সমন্বয়, দাপ্তরিক কাগজপত্র তৈরি, অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোও ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এ সংকট আরও বেশি। এসব এলাকায় শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি প্রধান শিক্ষক না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন
চাঁদপুরে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ৬৪২ বিদ্যালয়
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, শিশুদের শিক্ষার মান ও বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করা প্রয়োজন। নিয়মিত প্রধান শিক্ষক নিয়োগ হলে শিক্ষকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব কমবে, প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আসবে এবং শিক্ষার্থীদের পাঠদানও আরও সুন্দরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়ে। বিশেষ করে চরাঞ্চলে নজর দেওয়ার জন্য। এমনকি ক্লাস না করানোর অভিযোগে চরাঞ্চলের কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব পদে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এনএইচআর/জেআইএম
বিজ্ঞাপন