বিজ্ঞাপন
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই গল্পের শুরু। কী খেল, কার সঙ্গে খেলল, স্কুলে কে কী বলেছে, কোন কার্টুনের চরিত্র তার সবচেয়ে পছন্দ-সবকিছুই অনর্গল বলে যায় শিশু। কখনো খেলনা হাতে নিয়ে নিজের মতো গল্প বানায়, কখনো আবার পছন্দের কার্টুন চরিত্রের অভিনয় করে।
কিন্তু স্কুলের গেট পেরোনোর পর সেই পরিচিত শিশুটিকেই যেন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। শিক্ষকের কোনো প্রশ্নে উত্তর দেয় না, সহপাঠীদের সঙ্গে কথাবার্তাও নেই। টিফিনের সময়ও অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে থাকে।
এমন আচরণ দেখলে অভিভাবকের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে যে,বাড়িতে যে শিশু এত প্রাণবন্ত, স্কুলে গেলেই সে কেন চুপ হয়ে যায়? অনেক সময় এর উত্তরকে শুধু ‘লাজুক স্বভাব’ বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু সব ক্ষেত্রে বিষয়টি এত সহজ নয়।
বাড়িতে প্রাণচঞ্চল, স্কুলে একেবারে চুপ থাকলে কারণ জানার উচিত
নির্দিষ্ট পরিবেশে কথা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ
কিছু শিশুর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মানুষ বা পরিবেশের সামনে কথা বলার সময় তীব্র অস্বস্তি বা উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। বাড়িতে পরিচিত মানুষদের মধ্যে তারা স্বাভাবিক থাকলেও স্কুল, অপরিচিত জায়গা কিংবা অনেক মানুষের সামনে নিজেদের প্রকাশ করতে গিয়ে আটকে যায়। এই সমস্যাকে বলা হয় ‘সিলেক্টিভ মিউটিজম’।
এটি উদ্বেগ বা অ্যাংজাইটির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সমস্যা। অর্থাৎ শিশু ইচ্ছা করে চুপ করে থাকে না। অনেক সময় সে উত্তর জানে, কিছু বলতে চায়, এমনকি নিজের প্রয়োজনও বোঝাতে চায়, কিন্তু উদ্বেগের কারণে কথা বলা কঠিন হয়ে পড়ে।
ভয় পেলে মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়াও বদলে যায়
অতিরিক্ত ভয় বা উদ্বেগের সময় মানুষের শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার একটি হলো ‘ফ্রিজ’ হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা বা সেখান থেকে সরে যাওয়ার বদলে শরীর ও মন সাময়িকভাবে স্থবির হয়ে যেতে পারে। কিছু শিশুর ক্ষেত্রেও সামাজিক পরিস্থিতিতে এমন প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
তখন শিশুকে বাইরে থেকে দেখে মনে হতে পারে সে ইচ্ছা করেই কারো সঙ্গে কথা বলছে না। অথচ তার ভেতরে চলতে পারে অস্বস্তি, ভয় কিংবা পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা।
লাজুকতার সঙ্গে সিলেক্টিভ মিউটিজমের পার্থক্য
নতুন জায়গায় গিয়ে কিছুটা চুপচাপ থাকা শিশুর স্বাভাবিক আচরণের অংশ হতে পারে। অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলতে সময় নেওয়া বা প্রথম দিকে মিশতে না চাওয়াও অস্বাভাবিক নয়। পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর যদি শিশু ধীরে ধীরে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে শুরু করে, তাহলে সেটি সাধারণ লাজুকতার অংশ হতে পারে।
কিন্তু নির্দিষ্ট পরিবেশে দীর্ঘ সময় ধরে একইভাবে কথা না বলা, অথচ বাড়িতে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক থাকা বিষয়টি আলাদা করে নজরে রাখা প্রয়োজন। আচরণটি কতদিন ধরে চলছে এবং শিশুর দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব কতটা-সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
যে বিষয়টি অনেক সময় চোখ এড়িয়ে যায়
এই ধরনের শিশু সাধারণত খুব বেশি সমস্যা তৈরি করে না। তারা চুপচাপ থাকে, ক্লাসে বসে থাকে এবং অন্যদের বিরক্তও করে না। ফলে শিক্ষক বা পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় ধরে নেন, শিশুটি শান্ত কিংবা স্বভাবগতভাবে লাজুক।
কিন্তু দীর্ঘদিনের নীরবতা শিশুর জন্য বাস্তব সমস্যা তৈরি করতে পারে। কোনো কিছু বুঝতে না পারলেও শিক্ষককে প্রশ্ন করতে না পারা, পানি বা টয়লেটের প্রয়োজন জানাতে না পারা কিংবা কোনো সমস্যায় সাহায্য চাইতে না পারার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বন্ধু তৈরি করা এবং সামাজিক পরিবেশে স্বচ্ছন্দ হওয়ার মেশার ক্ষেত্রেও বাধা আসতে পারে।
‘কথা বলো’ বলে চাপ দেওয়া ঠিক নয়
শিশু কথা না বললে বারবার প্রশ্ন করা, সবার সামনে উত্তর দিতে বাধ্য করা কিংবা ‘এত লজ্জা পাও কেন?’-এ ধরনের মন্তব্য করা উচিত নয়। এতে শিশুর অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে।
তার বদলে তাকে নিরাপদ পরিবেশ দিতে হবে। পরিবারের সদস্যদের উচিত শিশুর কথা মন দিয়ে শোনা এবং নিজের অনুভূতি প্রকাশের জন্য তাকে সময় দেওয়া। শিক্ষককেও শিশুটির ওপর অযথা চাপ না দিয়ে ধীরে ধীরে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
আরও পড়ুন
মা হওয়ার আগে ও পরে নারীর যেসব যত্ন জরুরি
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিশুর নীরবতাকে অবাধ্যতা বা অহংকার হিসেবে না দেখা। যদি দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট পরিবেশে কথা বলার সমস্যা থাকে এবং তা পড়াশোনা, বন্ধুত্ব বা দৈনন্দিন কাজে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
আরও পড়ুন
শহরের শিশুরা কেন ঘরের মধ্যে আটকে থাকে?
কারণ কখনো কখনো একটি শিশুর নীরবতা আসলে তার মনের ভেতরের ভয় বা উদ্বেগের ভাষা। সেই নীরবতাকে বুঝতে পারাই হতে পারে তাকে স্বাভাবিক ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার প্রথম পদক্ষেপ।
সূত্র: চাইল্ড মাইন্ড ইনস্টিটিউট, ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, হিন্দুস্তান টাইমস
এসএকেওয়াই
বিজ্ঞাপন