বিজ্ঞাপন
পাহাড়েরও স্মৃতি আছে। গাছের শিকড়ে, মাটির স্তরে, ঝরনার জলে, পাথরের ভাঁজে সে স্মৃতি জমে থাকে। মানুষ সেই স্মৃতি পড়তে জানে না বলেই হয়তো বারবার একই ভুল করে। পাহাড় কেটে ঘর বানায়, বন কেটে রাস্তা বানায়, নদীর স্বাভাবিক পথ আটকে উন্নয়নের নাম দেয়—তারপর কোনো এক বর্ষার রাতে যখন পাহাড় ভেঙে পড়ে, নদী উন্মত্ত হয়ে ওঠে, তখন বিস্মিত হয়ে বলে, ‘এমন হলো কী করে?’
প্রকৃতি আসলে হঠাৎ প্রতিশোধ নেয় না। মানুষ দীর্ঘদিন ধরে যে ঋণ জমায়, দুর্যোগ অনেক সময় তারই হিসাব মেলায়। নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ দুর্যোগ সেই পুরোনো সত্যটিই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। হিমালয়ের উচ্চভূমি থেকে নেমে আসা বরফ, পাথর, কাদা ও পানির প্রবল স্রোত মুহূর্তের মধ্যে জনপদকে বিপর্যস্ত করেছে। ভোতে কোশি নদী অববাহিকা ও সীমান্তবর্তী এলাকায় সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানি, নিখোঁজ মানুষ, বিধ্বস্ত সড়ক ও সেতু, ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ অবকাঠামো—সব মিলিয়ে নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে তৈরি হয়েছে ভয়াবহ মানবিক সংকট।
নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, পুনর্গঠনে প্রয়োজন হতে পারে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই অর্থ দেশটির অর্থনীতির প্রায় দশ শতাংশের সমান। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতারও উল্লেখযোগ্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ পাহাড় থেকে নেমে আসা একটি দুর্যোগ শুধু মানুষের ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নেয়নি; তা একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিকেও নাড়িয়ে দিয়েছে।
এই জায়গায় এসে আমাদের থমকে দাঁড়ানো দরকার। কারণ নেপাল থেকে বাংলাদেশের দূরত্ব যতই থাক, বিপদের ভাষা আমাদের অচেনা নয়। বরং বাংলাদেশের পাহাড়গুলোতে আমরা অনেক দিন ধরেই এমন এক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করছি, যার পরিণতি আমাদের অজানা নয়।
চট্টগ্রামের পাহাড় কাটা হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ের ঢাল বদলে দেওয়া হচ্ছে। গাছ কাটা হচ্ছে। পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে উঠছে বসতি। কোথাও রাস্তা করতে গিয়ে পাহাড় কেটে ফেলা হচ্ছে, কোথাও আবাসন প্রকল্পের জন্য মাটি সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বর্ষার প্রবল বৃষ্টি এসে সেই ক্ষতস্থানগুলোতে পানি ঢুকিয়ে দেয়। মাটি নরম হয়, ঢাল দুর্বল হয়, তারপর একসময় পাহাড় ধসে পড়ে। মানুষ চাপা পড়ে। আমরা তখন বলি—‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’। এই শব্দবন্ধটির মধ্যে কখনো কখনো আমাদের দায় লুকিয়ে থাকে।
নেপালের এবারের দুর্যোগের তাৎক্ষণিক কারণ অবশ্যই বাংলাদেশের পাহাড় কাটার মতো নয়। সেখানে হিমবাহ, বরফ ও পাথরের অস্থিতিশীলতা থেকে আকস্মিক জলপ্রবাহ তৈরি হয়েছে বলে প্রাথমিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয় অঞ্চলের তাপমাত্রা বাড়ছে, হিমবাহের পরিবর্তন হচ্ছে এবং উচ্চভূমির বরফ-পাথরের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ফলে হিমবাহ-সম্পর্কিত বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকিও নতুন মাত্রা পাচ্ছে। কিন্তু এখানেই একটি গভীর শিক্ষা আছে।
প্রাকৃতিক বিপদ আর মানবসৃষ্ট ঝুঁকি এক জিনিস নয়। কিন্তু মানুষের কর্মকাণ্ড প্রাকৃতিক বিপদকে কতটা ভয়াবহ দুর্যোগে পরিণত করবে, তা অনেকাংশেই মানুষের হাতে। বৃষ্টি হবে—এটি প্রাকৃতিক ঘটনা। কিন্তু পাহাড়ের গায়ে যদি বন না থাকে, পানি নামার স্বাভাবিক পথ যদি বন্ধ থাকে, পাহাড়ের ঢাল যদি কেটে দুর্বল করা হয়, নদী-খাল যদি দখল করা হয়, তাহলে সেই বৃষ্টি আর শুধু বৃষ্টি থাকে না। তা হয়ে ওঠে মৃত্যুর বাহন।
হিমালয়ের বরফ গলছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ উঁচু হচ্ছে। অতিবৃষ্টির ধরন বদলাচ্ছে। কোথাও দীর্ঘ খরা, কোথাও অস্বাভাবিক বৃষ্টি। প্রকৃতির পুরোনো ছন্দ বদলে যাচ্ছে। অথচ আমরা এখনো অনেক উন্নয়ন পরিকল্পনা করছি অতীতের আবহাওয়ার হিসাব ধরে। এটি আর নিরাপদ নয়।
বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলের জন্য এই সত্যটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য। ২০০৭ সালে চট্টগ্রামে ভয়াবহ পাহাড়ধসে ১২৮ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। পাঁচ বছর পর ২০১২ সালেও টানা বর্ষণে পাহাড়ধসে প্রাণ হারান বহু মানুষ। প্রতিটি বড় দুর্যোগের পর তদন্ত হয়েছে, সতর্কতা জারি হয়েছে, পাহাড় কাটা বন্ধের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কয়েক বছর পর আমরা আবার একই দৃশ্য দেখেছি। এ যেন আমাদের জাতীয় স্মৃতির এক অদ্ভুত দুর্বলতা—দুর্যোগের দিন আমরা কাঁদি, দুর্যোগ চলে গেলে ভুলে যাই।
আইন আমাদের আছে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন পাহাড় ও টিলা কাটার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। প্রশাসনেরও ক্ষমতা আছে। পরিবেশ অধিদপ্তরেরও দায়িত্ব আছে। কিন্তু আইন থাকলেই প্রকৃতি রক্ষা হয় না; আইনের প্রয়োগ না থাকলে আইন কেবল কাগজের অক্ষর হয়ে থাকে।
পাহাড় কাটার সঙ্গে তাই শুধু শ্রমিক বা ছোটখাটো ব্যবসায়ীকে দায়ী করে লাভ নেই। দেখতে হবে কারা জমির ব্যবসা করছে, কারা অনুমোদন দিচ্ছে, কারা চোখ বন্ধ রাখছে, কারা রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করছে। পাহাড় কাটার অর্থনৈতিক লাভ যদি ব্যক্তি পায় আর পাহাড়ধসের ক্ষতি যদি রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষ বহন করে, তাহলে এই অসম সমীকরণ ভাঙতেই হবে। প্রকৃতির ওপর অত্যাচারের সবচেয়ে নির্মম দিক হলো—প্রকৃতি তার ক্ষত বহন করে, কিন্তু ক্ষতির মূল্য দেয় মানুষ।
একটি পাহাড় কেটে যে বাড়িটি তৈরি হয়, তার মালিক হয়তো নিরাপদ শহরে চলে যেতে পারেন। কিন্তু পাহাড়ের নিচে বসবাসকারী দরিদ্র পরিবারটি কোথায় যাবে? যে মানুষটি সস্তা ভাড়ার আশায় পাহাড়ের পাদদেশে ঘর বানিয়েছেন, দুর্যোগের রাতে তিনিই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েন। তাই পাহাড় রক্ষার প্রশ্নটি শুধু পরিবেশের প্রশ্ন নয়। এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নও। আমাদের উন্নয়ন-চিন্তায় এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি অনুপস্থিত।
রাস্তা দরকার, কিন্তু কোন পথে রাস্তা হবে? বসতি দরকার, কিন্তু কোথায় বসতি হবে? বিদ্যুৎকেন্দ্র দরকার, কিন্তু তার জন্য পাহাড়ের কোন অংশ কাটা যাবে? পর্যটন দরকার, কিন্তু পর্যটনের নামে পাহাড়ের কতটা কংক্রিটে ঢেকে দেওয়া যাবে? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত নিজের জন্যই বিপদ তৈরি করে। নেপালের কাছ থেকে আমাদের তাই শুধু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার শিক্ষা নিলে চলবে না; নিতে হবে ‘ঝুঁকি না বাড়ানোর উন্নয়ন’-এর শিক্ষা।
আমাদের পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি করা দরকার। কোন পাহাড় বসতির জন্য নিরাপদ, কোন পাহাড় সংরক্ষণ করতে হবে, কোথায় নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ—এসব তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত। নতুন কোনো স্থাপনা নির্মাণের আগে ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে।
পাহাড় কাটার অনুমতি যদি কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে দিতেই হয়, তবে তার পরিবেশগত ক্ষতি, পানি নিষ্কাশন, ঢালের স্থিতিশীলতা ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রকাশ্য হতে হবে। ‘অনুমোদন’ শব্দটি যেন পাহাড় ধ্বংসের ছাড়পত্র না হয়ে ওঠে।
এর পাশাপাশি পাহাড়ি বনকে দেখতে হবে অবকাঠামো হিসেবে। একটি বন কেবল গাছের সমষ্টি নয়। গাছের শিকড় মাটিকে ধরে রাখে, পাতার স্তর বৃষ্টির পানি শোষণ করে, বন পাহাড়ের ঢালকে স্থিতিশীল রাখে। একটি পরিণত বন ধ্বংস করে সেখানে কয়েক হাজার চারা লাগানো মানেই আগের বন ফিরিয়ে আনা নয়। আমাদের বননীতি তাই ‘কত গাছ লাগানো হলো’ থেকে ‘কতটা কার্যকর বন টিকে থাকল’—এই প্রশ্নে যেতে হবে।
দুর্যোগের আগাম সতর্কতাও জরুরি। পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাসকে ভূমিধসের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বৃষ্টিপাতের মাত্রা, মাটির আর্দ্রতা, নদীর পানি বৃদ্ধি ও পাহাড়ের ঢালের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণে প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। সতর্কবার্তা শুধু সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করলেই হবে না; তা মানুষের মোবাইল ফোনে পৌঁছাতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবক ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
কারণ দুর্যোগের সময় একটি সতর্কবার্তার মূল্য কখনো কখনো একটি জীবনের সমান। এখানে নেপালের আরেকটি অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে বন ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। কমিউনিটি ফরেস্ট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্থানীয় মানুষ বন রক্ষার অংশীদার হয়েছে। বাংলাদেশের পাহাড়েও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে টেকসই বন সংরক্ষণ সম্ভব নয়।
যে মানুষ পাহাড়ে থাকে, তাকে পাহাড় রক্ষার অংশীদার করতে হবে। পাহাড় রক্ষা করলে তার আয়, পানি, কৃষি, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কীভাবে নিরাপদ হবে—তার বাস্তব অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা দিতে হবে।
সবশেষে আসতে হবে জলবায়ু পরিবর্তনের কথায়। হিমালয়ের বরফ গলছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ উঁচু হচ্ছে। অতিবৃষ্টির ধরন বদলাচ্ছে। কোথাও দীর্ঘ খরা, কোথাও অস্বাভাবিক বৃষ্টি। প্রকৃতির পুরোনো ছন্দ বদলে যাচ্ছে। অথচ আমরা এখনো অনেক উন্নয়ন পরিকল্পনা করছি অতীতের আবহাওয়ার হিসাব ধরে। এটি আর নিরাপদ নয়।
ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে এমন অবকাঠামো তৈরি করতে হবে, যা শুধু আজকের জন্য নয়, আগামী কয়েক দশকের জলবায়ু ঝুঁকি মাথায় রেখে নির্মিত। পাহাড়, নদী, বন ও জলাভূমিকে উন্নয়নের বাধা হিসেবে নয়, উন্নয়নের অবকাঠামোর অংশ হিসেবে দেখতে হবে। নেপালের পাহাড় থেকে আসা বার্তাটি তাই খুব সরল—প্রকৃতিকে অবজ্ঞা করার ক্ষমতা মানুষের নেই।
আমরা পাহাড় কাটতে পারি। পাহাড়ের উচ্চতা কমাতে পারি। বন উজাড় করতে পারি। নদীর গতিপথ বদলাতে পারি। কিন্তু পাহাড়ের ঢাল যখন ভেঙে নামবে, তখন তাকে থামানোর মতো কোনো বুলডোজার আমাদের হাতে থাকবে না। নদী যখন বাঁধ ভেঙে ছুটবে, তখন প্রশাসনিক নির্দেশ দিয়ে তাকে থামানো যাবে না। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধের শেষ দৃশ্যটি তাই প্রায় সব সময় একই—মানুষ পরাজিত হয়। কিন্তু পরাজিত হওয়া অনিবার্য নয়।
আমরা চাইলে পাহাড়কে পাহাড়ের মতো থাকতে দিতে পারি। বনকে বন হিসেবে বাঁচতে দিতে পারি। নদীকে তার স্বাভাবিক পথ ফিরিয়ে দিতে পারি। উন্নয়নকে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের ভাষা শেখাতে পারি। দুর্যোগের পরে উদ্ধার অভিযান অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু তার চেয়েও প্রয়োজন এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে উদ্ধার অভিযানের প্রয়োজন কমে আসে।
নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের দিকে তাকিয়ে আমাদের তাই শুধু মৃতের সংখ্যা গোনা উচিত নয়। গুনতে হবে আমাদের ভুলের সংখ্যাও। কারণ অন্য দেশের পাহাড় ভাঙার শব্দ অনেক সময় নিজের দেশের ভবিষ্যতের প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে। আজ নেপালের পাহাড় কাঁদছে।
প্রশ্ন হলো—আমরা কি সেই কান্না শুনব, নাকি আমাদের পাহাড় ভেঙে পড়ার অপেক্ষা করব? প্রকৃতি শেষবারের মতো সতর্ক করে না। তার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করলে একদিন সতর্কবার্তার জায়গা নেয় ধ্বংস। নেপালের দুর্যোগ যা বলে গেল।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট।, ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ। drharun.press@gmail.com
এইচআর/জেআইএম
বিজ্ঞাপন