বিজ্ঞাপন
ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার বাইশরশি গ্রামের বাসিন্দা আওয়াল ব্যাপারী। বয়স ৬৫ বছর। একসময় চা বিক্রি করে মাসে আয় করতেন দুই হাজার টাকার মতো। সেই সামান্য আয়ে স্ত্রী ও তিন ছেলেকে নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতেন তিনি। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটতো। এবার দেখা দিয়েছে সুদিন। তৈরি করছেন পাটপণ্য। এতে যাবতীয় খরচ বাদ দিয়ে মাসে তার নিট আয় থাকছে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। তার তৈরি পণ্য যাচ্ছে আড়ংয়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সংসারের অভাব-অনটন আর দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে ২৮ বছর আগে পাট দিয়ে পণ্য তৈরির কাজ শুরু করেন আওয়াল ব্যাপারী। এরপর ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে তার জীবন। এখন তার তৈরি পাটের মানিব্যাগ ও হ্যান্ডব্যাগ বিক্রি হচ্ছে আড়ংয়ে। আর এই আয়েই সংসারে ফিরেছে সচ্ছলতা। দুই ছেলেকে পাঠিয়েছেন বিদেশে। আরেক ছেলে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। নিজে জমি কিনে তৈরি করেছেন একতলা বাড়ি।
২৮ বছর ধরে তাঁতে পাট দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি করছেন আওয়াল ব্যাপারী। এর মধ্যে রয়েছে পুরুষদের দুই ধরনের মানিব্যাগ ও নারীদের হ্যান্ডব্যাগ। বর্তমানে তিনি মাসে দেড় হাজারের মতো পণ্য তৈরি করেন। এর মধ্যে রয়েছে এক হাজার মানিব্যাগ ও ৫০০টি হ্যান্ডব্যাগ। কাজ শুরুর সময় থেকেই দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্র্যান্ড আড়ংয়ের সঙ্গে কাজ করছেন তিনি।
‘সংসারের অভাব-অনটন আর দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে ২৮ বছর আগে পাট দিয়ে পণ্য তৈরির কাজ শুরু করেন আওয়াল ব্যাপারী। এরপর ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে তার জীবন। এখন তার তৈরি পাটের মানিব্যাগ ও হ্যান্ডব্যাগ বিক্রি হচ্ছে আড়ংয়ে। আর এই আয়েই সংসারে ফিরেছে সচ্ছলতা। দুই ছেলেকে পাঠিয়েছেন বিদেশে। আরেক ছেলে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। নিজে জমি কিনে তৈরি করেছেন একতলা বাড়ি’
বাইশরশি গ্রামের আওয়াল ব্যাপারীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, নিজের বাড়িটিই এখন আওয়ালের কর্মস্থল। তাঁতের কাঠের মাকু একবার এদিক, একবার ওদিক ছুটছে। পাটের সুতায় ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে একটি মানিব্যাগের অবয়ব। পাশে সাজানো রয়েছে তৈরি করা পাটপণ্য। আওয়াল আপন মনে কাজ করে চলেছেন। তার পাশেই স্ত্রী তাহমিনা ব্যস্ত পাটপণ্য তৈরির কাজে।
আওয়াল ব্যাপারীর স্ত্রী তাহমিনা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাড়ির পাশে সেলাইয়ের কাজ শেখাবে, এটা জেনেই প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। কিন্তু সেই প্রশিক্ষণ যে আজ আমাদের ভাগ্য বদলে দেবে তা জানা ছিল না। এখন আমরা এই কাজ করে খুব ভালো আছি। আল্লাহ যতদিন সক্ষমতা দেবেন, ততদিন এই কাজ করে যাবো।’
আরও পড়ুন
জামের রস যাচ্ছে বিদেশে, বিচিও ফেলনা নয়
তাহমিনাই প্রথম পাটপণ্য তৈরির প্রশিক্ষণ নেন। একসময় তাদের ছেলেরাও কাজে সহযোগিতা করতেন। তবে এখন আর তারা এ কাজে যুক্ত নন। ফলে স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে পুরো কাজ সামলাচ্ছেন।
‘চা বিক্রি করে সংসার চালাতে খুব কষ্ট হতো। তখন মাসে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা আয় করতাম। পাট দিয়ে পণ্য তৈরি শুরু করার পর ধীরে ধীরে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। এখন বাড়িতে বসেই কাজ করতে পারি। সংসার চালাতে পারি’—আওয়াল ব্যাপারী
কথা হয় আওয়াল ব্যাপারীর সঙ্গে। তিনি জানান, বাড়ির পাশে নারীদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে একটি বিআরডিবি সংস্থার উদ্যোগে পাটপণ্য তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। সেখান থেকে তার স্ত্রী তাহমিনা বেগম প্রশিক্ষণ নেন। এরপর স্ত্রীকে সহযোগিতা করতে গিয়ে চায়ের দোকান বাদ দিয়ে তিনিও পাটপণ্য তৈরির কাজে যুক্ত হন।
আরও পড়ুন
শখের বশে শুরু, রঙিন তরমুজ চাষে লাখোপতি মিনহাজ
আওয়াল ব্যাপারী জাগো নিউজকে বলেন, ‘শুরুতে ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলা থেকে পাটের চট সংগ্রহ করে বিভিন্ন পণ্য তৈরির কাজ করতাম। পরে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে পাঁচটি তাঁত কিনে নিজ বাড়িতে কাজ শুরু করি। তাঁত কেনার পর নিজে এবং আরও তিনজন শ্রমিক মিলে পাটের চট তৈরি করি। আমার স্ত্রী সেগুলো দিয়ে বিভিন্ন পাটপণ্য তৈরি করতো। তখন মাসে আড়াই থেকে তিন হাজার পিস পণ্য তৈরি করতাম।’
তিনি বলেন, ‘চা বিক্রি করে সংসার চালাতে খুব কষ্ট হতো। তখন মাসে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা আয় করতাম। পাট দিয়ে পণ্য তৈরি শুরু করার পর ধীরে ধীরে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। এখন বাড়িতে বসেই কাজ করতে পারি। সংসার চালাতে পারি।’
আরও পড়ুন
শখের নার্সারি থেকে রাখির মাসে আয় লাখ টাকা
আওয়াল ব্যাপারীর তৈরি একটি পাটের মানিব্যাগ আড়ংয়ে ১০০ টাকা দামে বিক্রি হয়। এ থেকে তিনি পান ৭০ টাকা। আর ১৫০ টাকা দামের একটি হ্যান্ডব্যাগের জন্য পান ১১৫ টাকা।
উদ্যোক্তা আওয়াল ব্যাপারী জানান, এই আয় দিয়ে শুধু সংসারই চালাননি, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তেও অর্থ ব্যয় করেছেন। দুই ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছেন। তাদের বিদেশ পাঠাতে প্রায় ১৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আরেক ছেলে মাস্টার্স শেষ করে বর্তমানে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।
আরও পড়ুন
ঘর থেকেই গড়ে ওঠে তামান্নার সফলতার সিঁড়ি
তবে আক্ষেপও রয়েছে আওয়াল ব্যাপারীর। তিনি বলেন, ‘এখন আর তাঁতের কাজ করার জন্য শ্রমিক পাওয়া যায় না। তাই অনেকটা বাধ্য হয়ে তিনটি তাঁত বন্ধ করে দিতে হয়েছে।’
এ বিষয়ে তাঁত বোর্ডের ভাঙ্গা বেসিক সেন্টারের লিয়াজোঁ অফিসার মামুনুর রশীদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আওয়াল ব্যাপারী হস্তচালিত তাঁত দিয়ে পাটপণ্য তৈরি করেন। এটি তাঁতশিল্পের জন্য ভালো দিক। তাঁত ব্যবহার করে তিনি যে ধরনের পণ্য তৈরি করছেন, তা সত্যিই অসাধারণ।’
তিনি আরও বলেন, তাঁতকে ব্যবহার করে কাপড়ের পাশাপাশি অন্যান্য পণ্য তৈরি করে যদি আরও মানুষ স্বাবলম্বী হতে পারেন, সেটাই আমাদের চাওয়া। এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে তাঁতশিল্প টিকে থাকবে।
এসআর/জেআইএম
বিজ্ঞাপন