বিজ্ঞাপন
‘ধনঞ্জয়দা, তুমি যে বড় চলে যাচ্ছ!’ ‘আমার কাজ যে ফুরিয়েছে।’ ‘তুমি কি আর আসবে না?’ ‘আমার আসার আর দরকারই হবে না…’ ১৯৬৬ সালে মুক্তি পাওয়া বিখ্যাত বাংলা সিনেমা গল্প হলেও সত্য-এর শেষ দৃশ্যের এই সংলাপগুলো আজ অদ্ভুতভাবে মনে করিয়ে দিচ্ছে আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসির বিদায়কে। একটি সংসারের মধ্যমণি হয়ে থাকা ধনঞ্জয়ের মতোই আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসিও ছিলেন একটি প্রজন্মের আবেগের কেন্দ্রবিন্দু। দুই দশক ধরে সেই সংসার আগলে রাখার পর এবার তিনিই বলে গেলেন, ‘আমি আমার সবটুকু দিয়ে দিয়েছি, আমার আর দেওয়ার মতো কিছু নেই।’
২০০৫ সালের এই আগস্টেই আর্জেন্টিনার জার্সিতে আন্তর্জাতিক ফুটবলে পা রেখেছিলেন লিওনেল মেসি। বদলি হিসেবে নেমে ঝাঁকড়া চুলের সেই তরুণ মেসি মাঠে ছিলেন মাত্র ৪৭ সেকেন্ড। এরপরই লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। লাল কার্ড দিয়ে শুরু, এরপর উত্থান-পতনের কত না গল্প! ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে নিজ দেশেই তার বিরুদ্ধে উঠেছে সমালোচনার ঝড়, এমনকি জারি হয়েছে যেন একরকম হুলিয়া। ফাইনালে হেরে কেঁদেছেন, রাগ-অভিমানে অবসরও নিয়েছেন। আবার ফিরেছেন, আর সেই ফিরে আসাতেই জিতেছেন পরম আরাধ্য বিশ্বকাপ।
আরও পড়ুন
অবসর ঘোষণার চিঠিতে যা লিখলেন মেসি
বারবার ভেঙেছে স্বপ্ন, ভিজেছে চোখ, উঠেছে প্রশ্ন — আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি নিজের সর্বোচ্চটা দিচ্ছেন কি না, সেটিও শুনতে হয়েছে। তবু থামেননি তিনি। বরং ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে যেন একে একে চুকিয়ে দিয়েছেন সব না পাওয়ার হিসাব। জিতেছেন কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা, সবশেষে বিশ্বকাপ। যে ক্যারিয়ার একসময় অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাস হয়ে উঠেছিল, শেষবেলায় এসে সেটিই পরিণত হয়েছে পূর্ণতার এক মহাকাব্যে।
২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনাল, কিংবা ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনাল। সেই সময়ের আর্জেন্টিনা যেন দাঁড়িয়ে ছিল এক অদ্ভুত বাস্তবতার সামনে। সবকিছু মেসিকেই করতে হবে, বাকিরা শুধু তার পাশে থাকবে। আর্জেন্টিনার হয়ে জিততে হলে মেসিকেই হতে হবে মূল কাণ্ডারি, মেসিকেই হতে হবে শেষ ভরসা। এমনকি ফাইনাল হেরে চোখের জল ফেলতেও যেন নেতৃত্ব দিতে হয়েছিল তাকেই।
কিন্তু ২০১৮ বিশ্বকাপের পর বদলাতে শুরু করল সেই গল্প। লিওনেল স্কালোনি দায়িত্ব নিলেন, আর আর্জেন্টিনা পেল একদল তরুণকে। যারা মেসির জন্য প্রয়োজনে জীবন দিতেও প্রস্তুত। তবে পার্থক্যটা ছিল অন্য জায়গায়। তারা মেসির কাঁধে সবকিছু তুলে দিয়ে নিজেরা শুধু তার দিকে তাকিয়ে থাকেনি; বরং মেসির জন্যই সবকিছু ছিনিয়ে আনতে চেয়েছে। মেসিকে একা জিততে হবে এই ধারণা বদলে তারা দাঁড়িয়েছে মেসির পাশে, তার জন্য লড়াই করেছে। আর সেখান থেকেই শুরু হয়েছে আর্জেন্টিনা ও মেসির সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।
২০২১ সালে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। ব্রাজিলকে হারিয়ে মারাকানা স্টেডিয়ামে কোপা আমেরিকা জিতলো আর্জেন্টিনা, মেসির প্রথম আন্তর্জাতিক ট্রফি। এই মারাকানাতেই ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল মেসি ও আর্জেন্টিনার। যেন বহু বছরের না পাওয়ার গল্পটা সেদিন প্রথমবার বাঁক নিল।
এরপরই শুরু হলো মেসির সুদিন, যে জার্সিতে একটা ট্রফি জয়ের আকুতি মিনতি করতেন সবসময়। তাতে ৩ বছরে জিতলেন ৪টি ট্রফি। ২০২১ এ কোপা। ২০২২ এ ৩৬ বছরের খরা কাটিয়ে বিশ্বকাপ, এরপর ফাইনালিসিমা ও ২০২৩ সালে আবার কোপা! একসময় যে ক্যারিয়ার অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাস হয়ে উঠেছিল, শেষবেলায় এসে সেটিই পরিণত হলো পূর্ণতার এক মহাকাব্যে।
অথচ এই মেসি বার্সেলোনার হয়ে সব জিতে গেলেও আর্জেন্টিনার হয়ে শিরোপা জেতার জন্য রাস্তাই খুঁজে পাচ্ছিলেন না। বারবার খালি হাতে ফিরতে ফিরতে মেসি শেষ পর্যন্ত সব জিতেই গেলেন! লোকে বলে, বিশ্বকাপটা মেসি একা জেতেননি। সেদিন মেসির সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য মেসি ও আর্জেন্টিনা সমর্থকরাও জিতেছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা, মেসি তার ভক্তদের এক দীর্ঘ অপেক্ষা আর এক ভয়ংকর অভিশাপ থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। নিজে বিশ্বকাপ জিতে সর্বকালের সেরাদের কাতারে তো উঠেছেনই, কিন্তু তার কোটি কোটি ভক্তকে যে স্বর্গীয় সুখ দিয়েছেন সেটা অবিশ্বাস্য।
তার পায়ে বল মানেই অন্যরকম উত্তেজনা, তার গোল মানেই অকারণ এক আনন্দ। আবার সেই মানুষটাই হেরে গেলে নিজের অজান্তেই মনটা ভার হয়ে যেত। ফুটবল দেখতে দেখতে কখন যে একজন খেলোয়াড় আমাদের জীবনের স্মৃতির অংশ হয়ে গেলেন, টেরই পাইনি।
আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জয়ের পর ট্রফির দিকে তাকিয়ে মেসির শিশুসুল্ভ সেই হাসির কথা মনে আছে? তখন যেন পৃথিবীরি অন্য কোনো ভাষায় তার মনে বাজছিল, ‘অনেক সাধনার পরে আমি পেলাম তোমার মন, পেলাম খুঁজে এ ভুবনে, আমার আপনজন।’ আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির নিবেদন ছিল ঈর্ষণীয়। কিন্তু ট্রফি না জেতায় সেটা নিয়েও নিন্দুকেরা প্রশ্ন তোলা শুরু করেছিল। শেষবেলায় অবশ্য আর আক্ষেপ রাখেননি, জিতেছেন সবই! তবু কি একটা আক্ষেপ থেকেই গেলো, ‘মাঠ থেকে বিদায় নিলেন না।’
মেসির অবশ্য এসবের আর মনই নেই! নিজেই বলেছেন গত ১৯ জুলাই বিশ্বকাপ ফাইনাল হারের দুদিন পরই অবসর বার্তা লিখে রেখেছিলেন। এর কয়েকদিন পর বাবা হোর্হে মেসি মারা যাওয়ার পর সিদ্ধান্ত নিয়ে আর কোনো দ্বিধা বাকি নেই। বিদায় বার্তায় তিনি লিখছিলেন, ‘এই কথাগুলো আমি ২১ জুলাই, ফাইনালের দুই দিন পর লিখেছিলাম। আজ আমার বাবাকে ঘিরে যা ঘটেছে, তার পর আমি আগের চেয়েও বেশি নিশ্চিত।’
মেসিকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে দেখা চরম সৌভাগ্যগুলোর একটি। বল পায়ে তার ছুটে চলা নৈসর্গিক দৃশ্যের চেয়েও বেশি কিছু ছিল। মেসিকে দেখেই কোটি যুবক ফুটবলকে ভালোবেসেছে, তার সঙ্গে হেসেছি, কেঁদেছে, হেরেছে, আবার জয়ের উল্লাসে মেতেছে। মেসি বিদায় বার্তায় তাকে আর্জেন্টাইন করার জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। হয়তো তার ভক্তরাও ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাবেন তার সময়ে পৃথিবীতে থাকতে দেওয়ার জন্য।
মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়ের সংখ্যাগুলোও যেন তার এই দীর্ঘ যাত্রার গল্প বলে। জাতীয় দলের হয়ে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল ও ৬৮ অ্যাসিস্ট। আর্জেন্টিনার জার্সিতে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ ও গোলের মালিক তিনি। জিতেছেন ২০২২ বিশ্বকাপ, ২০২১ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা, ২০২২ ফিনালিসিমা, ২০০৮ অলিম্পিকে স্বর্ণ ও ২০০৫ অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপেও তার ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষী ইতিহাস — ২০১৪ ও ২০২২ সালে জিতেছেন গোল্ডেন বল।
আরও পড়ুন
লাল কার্ডে শুরু হয়েছিল মেসির ক্যারিয়ার
‘যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে হয়, যেতে হয়, পথের শেষে থামতে হয়,’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই উক্তিটাই আবার মনে করিয়ে দিলো মেসির অবসর! মেসিকে ফুটবল পায়ে দেখার যে অনুভূতি সেটা আর কিছুতেই মেটে না! তবু কিছু বিদায় আসলে মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। মানুষটা থেকে যেতে চাইলেও সময় তাকে থামিয়ে দেয়। ২১ বছরের মেসিডোনিয়া সভ্যতার ইতি টেনেছেন মেসি নিজেই, কিন্তু পুরো বিশ্বর উপরই যেন এই প্রভাব পড়লো
ধন্যবাদ, লিওনেল মেসি। জাতীয় দলের হয়ে ১২৫টি গোল করেছেন মেসি, পুরো বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। সবচেয়ে বড় কথা আর্জেন্টিনার ফুটবলকে পুনজর্ন্ম দিয়েছেন, একটা প্রজন্মকে বিশ্বকাপ জিততে না দেখার অভিশপ্ত কটুক্তি থেকে মুক্ত করেছেন। বিদায় বেলায় তাই বলতে হয় ‘তুমি রবে-নীরবে, হৃদয়ে মম।’
এসকেডি/আইএন
বিজ্ঞাপন