বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮ বছরের পথচলা এত সহজ ছিল না। নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আবার ক্ষমতার আসনে বিএনপি। দলটির হাল ধরেছেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও তার সহধর্মিণী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
কীভাবে ৪৮ বছরে দলটি রাজনীতিতে পাকাপোক্ত আসন তৈরি করলো আর কেনই বা এদেশের সাধারণ মানুষের মনে জায়গা করে নিলো সেসব নিয়ে আলোচনা চলে সব সময়। তবে উদারতার রাজনীতির প্রশ্নে বিএনপি বারবার তার রাজনিতিক গতিপথ পাল্টেছে। এতে অনেক সময় সমালোচনা হলেও সঠিক সিদ্ধান্তই দলটিকে আজ রাজনীতির সর্বোচ্চ আসনে বসিয়েছে।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠা করলেন বিএনপি। ৪৮ বছরের পথচলায় দলটি একাধিকবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেছে, ক্ষমতাচ্যুতও হয়েছে, দীর্ঘ সময় বিরোধীদলের দায়িত্ব পালন করেছে নির্বাচনে বড় জয় ও বড় পরাজয়ও মেনে নিয়েছে এবং প্রতিবারই নেতৃত্ব ও কৌশলে অভূতপূর্ব পরিবর্তন এনেছে।
প্রতিষ্ঠার কয়েক মাসের মধ্যেই ক্ষমতায় যাওয়া থেকে শুরু করে ১৯৮২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুতি, এরশাদবিরোধী আন্দোলন, ১৯৯১ সালে প্রত্যাবর্তন, ১৯৯৬ সালের ১২ দিনের সরকার, ২০০১ সালে বড় জয়, ২০০৮ সালের বিপর্যয়, ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন বর্জন, ২০১৮ সালের মাত্র সাত আসন এবং শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালে ২০৯ আসন নিয়ে আবার ক্ষমতায় ফেরা, প্রতিটি অধ্যায়ই বিএনপির রাজনৈতিক অভিযাত্রাকে করেছে আরও বিস্তৃত, অভিজ্ঞ ও পরিণত।
রাজনৈতিক যাত্রার ৪৮টি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
বিএনপির প্রতিষ্ঠা
১৯৭৮ সালের এই দিনে সেনাপ্রধান থেকে ক্ষমতায় আসা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ঢাকার রমনা বটমূলে এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করা হয়। জিয়াউর রহমান এই দলে তখন বাম, ডান, মধ্যপন্থি সব ঘরানার মানুষকে জায়গা দিয়েছিলেন। জানা যায় সে সময় দরের প্রায় ৪৫ শতাংশই ছিল তরুণ। দল প্রতিষ্ঠার ঘোষণার দিনই জিয়াউর রহমান বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন, আদর্শ, কর্মপন্থার কথা তুলে ধরেছিলেন সাংবাদিকদের সামনে।
১৯৭৮ সালের ১৯ দফা কর্মসূচি
প্রতিষ্ঠার সময়ই বিএনপি ১৯ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। পরবর্তী সময়ে এই ১৯ দফাই দলটির রাজনৈতিক কর্মসূচি ও পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। সে হিসেবেই দল সামনে দিকে এগোতে তাকে।
প্রতিষ্ঠার মাত্র ৬ মাস পর ১৯৭৯ সালে নির্বাচন
১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে জয় লাভ করে। প্রতিষ্ঠার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে বড় নির্বাচনি বিজয় দলটিকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।
১৯৭৯ সালে দ্বিতীয়বার সংসদে
১৯৭৯ সালে ২ এপ্রিল দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে। বিএনপি সরকার গঠন করে এবং শাহ আজিজুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হন সেসময়।
১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের শাহাদৎবরণ
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান নিহত হন। তার এই নিহত হওয়ার ঘটনা বিএনপির জন্য ছিল অশনিসংকেত। প্রতিষ্ঠাতার অনুপস্থিতিতে দলটি যে বড় নেতৃত্ব সংকটে পড়েছিল, সেই কঠিন সময়েও বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক পথচলা থেমে যায়নি।
১৯৮১ সালে আবদুস সাত্তারের নেতৃত্বে বিএনপি
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির নেতৃত্বে চলে আসেন। প্রতিষ্ঠাতার আকস্মিক প্রয়াণের পর তার নেতৃত্বে বিএনপি নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা ধরে রাখে। প্রতিষ্ঠাতা-পরবর্তী এই নেতৃত্ব পরিবর্তন বিএনপির সাংগঠনিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণভিত্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার সময় বলে গণ্য করা হয়।
১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুতি
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানে আবদুস সাত্তারের সরকার উৎখাত হয়। বিএনপি চলে যায় রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে।
১৯৮২ সালে খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে প্রবেশ
জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর দেশের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়। সেই সময়ে ধীরে ধীরে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে তার পথচলা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে তার দৃঢ় নেতৃত্ব, আপসহীন অবস্থান ও গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার বিএনপির রাজনীতিকে নতুন গতি দেয় এবং তাকে দলের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
১৯৮৩ সালে বিএনপিতে ভাঙন
প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলের শুরুতে নেতৃত্বের প্রশ্নে বিএনপি একাধিক অংশে বিভক্ত হয়। দলীয় সংকটের মধ্যেই খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে মূল বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন।
১৯৮৩ সালে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হক খালেদা জিয়া
১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী খালেদা জিয়া বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। এখান থেকেই তার দলীয় নেতৃত্বের প্রাতিষ্ঠানিক উত্থান শুরু হয়।
১৯৮৪ সালে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হন খালেদা জিয়া
খালেদা জিয়া ১৯৮৪ সালের ১২ জানুয়ারি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হন। কয়েক মাস পর ১০ মে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
১৯৮৪-৮৭: এরশাদবিরোধী আন্দোলন
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল বিএনপি। সে সময় রাজপথে সব দলকে জায়গা দিয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ধারাবাহিক কর্মসূচি চলতে থাকে। পরবর্তীতে এই আন্দোলন থেকে অনেকে বিচ্যুত হলেও রাজনপথ ছাড়েননি খালেদা জিয়া।
১৯৮৭ সালের ‘এক দফা’ আন্দোলন
এরশাদ সরকারের পতনের দাবিতে খালেদা জিয়া এক দফার আন্দোলনের ঘোষণা দেন। পরবর্তী সময় কয়েক বছরে এই আন্দোলনই বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রধান অংশ হয়ে ওঠে।
১৯৮৮ সালে নির্বাচন বর্জন
এরশাদ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ১৯৮৮ সালের সংসদ নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে। ফলে বিএনপির রাজনীতিতে নির্বাচন বর্জনের কৌশল প্রথম বড় আকার ধারণ করে। এতে সাধারণ মানুষেরও অংশগ্রহণ ছিল স্বতস্ফূর্ত।
১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়
বিএনপির নেত্বত্বে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। এর মধ্য দিয়ে বিএনপির জন্য নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফেরার পথ খুলে যায়।
১৯৯১ সালে নির্বাচনি প্রত্যাবর্তন
৯ বছর পর বিএনপির নির্বাচনি প্রত্যাবর্তন ঘটে ১৯৯১ সালে। সেবছর ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসন পায়। এরপর জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে দলটি সরকার গঠন করে।
খালেদা জিয়া প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
দেশের ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন ১৯৯১ সালে। পরবর্তীতে দলের প্রতি আরও বেশি আস্থাশীল হয়ে ওঠেন বেগম খালেদা জিয়া।
১৯৯১: সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন
১৯৯১ সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ আবার সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যায়। বিএনপি সরকারের আমলের এই পরিবর্তন দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর একটি বড় বাঁক বলা চলে।
১৯৯১–৯৬: প্রথম পূর্ণ মেয়াদের সরকার গঠন করে বিএনপি
১৯৯১ সালের সরকার বিএনপিকে শুধু আন্দোলনের দল থেকে রাষ্ট্র পরিচালনাকারী দলে রূপান্তর করে। পরবর্তীতে অর্থনীতি, প্রশাসন ও সংসদীয় রাজনীতিতে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করে দলটি।
১৯৯৪–৯৫: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জোরালো দাবি
নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে বিরোধী আন্দোলন তীব্র হতে থাকে সে সময়। এই সংকটই শেষ পর্যন্ত বিএনপির প্রথম মেয়াদের সরকারকে বড় রাজনৈতিক চাপে ফেলে।
বিতর্কিত ৯৬ এর ফেব্রুয়ারির নির্বাচন
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্যে বিএনপি ২৭৮টি আসন পায়। ভোটার উপস্থিতি ছিল মাত্র প্রায় ২১ শতাংশ। সেবছরই ১২ দিনের সংসদ গঠিত হয়। ১৯ মার্চ গঠিত ষষ্ঠ সংসদ ৩০ মার্চ বিলুপ্ত হয়। মাত্র ১২ দিন টিকে থাকা এই সংসদ বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে সবচেয়ে স্বল্পস্থায়ী সংসদ।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার সাংবিধানিক প্রবর্তন
১৯৯৬ সালে রাজনৈতিক সংকটের পর বিএনপি সরকারের আমলেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি হয়। এরপর দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের নির্বাচনি রাজনীতিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থায় পরিণত হয়।
১৯৯৬: জুনের নির্বাচনে ক্ষমতাচ্যুতি
১২ জুনের নির্বাচনে বিএনপি ১১৬টি আসন পায় এবং বর্তমান কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হারায়।
১৯৯৬ সালে সবচেয়ে বড় বিরোধী দল
১১৬ আসন নিয়ে বিএনপি বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে দীর্ঘ সময়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী শক্তির রেকর্ড তৈরি করেছিল।
চারদলীয় জোট
১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোটকে নিয়ে চারদলীয় জোট গঠন করেছিল। পরবর্তী নির্বাচনে এই জোটই বিএনপির ক্ষমতায় ফেরার প্রধান রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হয়ে দাঁড়ায়।
২০০১ সালে বড় নির্বাচনি প্রত্যাবর্তন
২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ১৯৩টি আসন পায়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট মোট ২১৫টি আসন নিয়ে সরকার গঠন করে সেসময়। দ্বিতীয়বার সরকার গঠন করেন বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ১০ অক্টোবর ২০০১ খালেদা জিয়া আবার প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০১–৬ মেয়াদ বিএনপির দ্বিতীয় পূর্ণ মেয়াদের সরকার হিসেবে দলটির রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়কার এই ঘটনা পরবর্তী বছরগুলোতে বিএনপির রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
দেশজুড়ে জঙ্গি হামলা
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের প্রায় সব জেলায় একযোগে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই সময়ের বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় প্রশ্ন ওঠে এবং পরবর্তী রাজনৈতিক বিতর্কেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে।
বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ ২০০৬
২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হয়। বিএনপি সরকার ক্ষমতা ছাড়ে এবং নির্বাচনকালিন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেন
২০০৭ সারের ১১ জানুয়ারি রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা নেয়। বিএনপির রাজনীতিতে এটি ছিল সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক ও নেতৃত্বগত ধাক্কাগুলোর একটি। সেবছর গ্রেফতার হন বেগম খালেদা জিয়া। বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে সে সময়।
২০০৮: নির্বাচনি বিপর্যয়
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিএনপি মাত্র ৩০টি আসন পায়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের মোট আসনও ছিল ৩৩। ২০০১ সালের ১৯৩ আসনের তুলনায় এটি ছিল বড় ধরনের পতন।
২০০৯ সালে দীর্ঘ বিরোধী অধ্যায়ের শুরু
২০০৮ সালের পর বিএনপি আবার বিরোধী দলে যায়। এরপর প্রায় ১৭ বছর রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির রাজনৈতিক চরিত্রকে দীর্ঘ আন্দোলন ও বিরোধী রাজনীতি নতুনভাবে গড়ে দেয়। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও দলটির এই দীর্ঘ বিরোধী পর্বকে প্রায় দুই দশকের হিসেবে বর্ণনা করেছে।
২০১১: তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। বিএনপি এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে এবং পরবর্তী বছরগুলোতে নির্বাচনকালিন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিকে তাদের আন্দোলনের কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত করে।
২০১৩: নির্বাচনকালিন সরকার নিয়ে সংঘাত
২০১৪ সালের নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে নির্বাচনকালিন সরকারব্যবস্থা নিয়ে সংঘাত তীব্র হয়। বিরোধী আন্দোলন, হরতাল ও অবরোধ বিএনপির রাজনীতিকে আবারও রাজপথকেন্দ্রিক করে তোলে।
২০১৪: নির্বাচন বর্জন
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচন বিএনপি ও তার জোট বর্জন করে। ১৫৩টি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। বিএনপি সংসদের বাইরে চলে যায়।
২০১৫: অবরোধের দীর্ঘ অধ্যায়
২০১৫ সালে সরকারবিরোধী অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হয়। দলটির রাজপথের আন্দোলনের কৌশল নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।
২০১৬: বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল
২০১৬ সালের কাউন্সিলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হন। একই সময়ে রুহুল কবির রিজভী সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন। পরবর্তী এক দশকে এই নেতৃত্ব বিএনপির বিরোধী রাজনীতির অন্যতম মুখ হয়ে ওঠে।
২০১৮: নির্বাচনে অংশগ্রহণ
দীর্ঘ বিরতির পর বিএনপি ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়। কিন্তু নির্বাচনে দলটি মাত্র সাতটি আসন পায়, ২০০৮ সালের বিপর্যয়ের পর এটি ছিল আরেকটি বড় নির্বাচনি ধাক্কা।
২০১৮: খালেদা জিয়ার কারাবন্দি হওয়া
২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুর্নীতি মামলায় সাজা হওয়ার পর খালেদা জিয়া কারাবন্দি হন। দলটির চেয়ারপারসনের কারাবন্দিত্ব বিএনপির নেতৃত্ব কাঠামো ও আন্দোলনের কৌশলে বড় পরিবর্তন আনে।
২০১৮: তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দলের কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকেন। লন্ডন থেকে দল পরিচালনার এই অধ্যায় বিএনপির নেতৃত্বের নতুন বাস্তবতা তৈরি করে।
২০২৪: আবার নির্বাচন বর্জন
২০২৪-এর ৭ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে। ফলে ২০১৪ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিএনপি জাতীয় নির্বাচন বর্জনের পথ বেছে নেয়।
২০২৪: আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ দেশের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দেয়। বিএনপির দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতির সামনে ক্ষমতায় ফেরার নতুন সুযোগ তৈরি হয়।
২০২৫: খালেদা জিয়ার মৃত্যু, নেতৃত্বে নতুনদের জায়গা
২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মারা যান। তার মৃত্যু বিএনপির চার দশকের বেশি সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব অধ্যায়ের অবসান ঘটায়।
২০২৬: তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নতুন অধ্যায়
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ১০ জানুয়ারি তারেক রহমান বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও দীর্ঘদিনের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পর তার নেতৃত্বে বিএনপি নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বে প্রবেশ করে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার সমন্বয়ে তারেক রহমানের হাতে বিএনপির নেতৃত্বে সূচনা হয় নতুন এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের।
২০২৬: ২০৯ আসনে বিএনপির ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন
২০২৬-এর ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ২০৯টি আসন পায় এবং প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দলটি ৩ কোটি ৭৪ লাখ ৬৮ হাজার ৯৯৪ ভোট পায়, যা মোট ভোটের ৪৯.৯৭ শতাংশ।
১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাসে এটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের পর তার স্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এবার তাদের ছেলে তারেক রহমানের হাতে রাষ্ট্র ও দলের নেতৃত্ব একত্রিত হয়েছে। তবে ২০২৬ সালের আগস্টে এই নেতৃত্ব কাঠামোতেও নতুন পরিবর্তন এসেছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর রুহুল কবির রিজভী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন। সামনে বিএনপির কাউন্সিলে হয়তো সেখানেও তরুণদের সমন্বয় ঘটিয়ে রাজনীতির গতিপথ আরও বিস্তৃত ও মসৃণ করবেন দলটির নীতিনির্ধারকরা।
কেএইচ/এসএনআর
বিজ্ঞাপন