বিজ্ঞাপন
হজরত সুলাইমানকে (আ.) আল্লাহ তাআলা বিশেষ কিছু ক্ষমতা দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে একজন নবী ও বাদশাহ। তার রাজত্ব ছিল বর্তমান দখলকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে। সেই আমলে এই অঞ্চলে ইয়াহুদা ও ইসরাইল নামে দুটো রাজ্য ছিল, হজরত সুলাইমান (আ.) দুটোকে একত্র করে শাসনকার্য চালিয়েছিলেন।
আল্লাহ তাআলা তাকে মানুষের পাশাপাশি জিন, পক্ষীকূল ও অন্যান্য প্রাণীকেও বশীভূত করার ক্ষমতা দিয়েছিলেন। তার কারণ হলো, একবার তিনি আল্লাহর দরবারে দোয়া করেছিলেন:
‘হে আমার পালনকর্তা, আমাকে মাফ করুন এবং আমাকে এমন সাম্রাজ্য দান করুন যা আমার পরে আর কেউ পেতে সক্ষম হবে না। নিশ্চয় আপনি মহাদাতা।’ (সুরা সোয়াদ: ৩৫)
তখন মহান আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেন এবং তাকে এমন এক বিস্ময়কর রাজত্ব দান করেন, যার অনুরূপ তার পূর্বেও কেউ পায়নি এবং তার পরেও কারও ভাগ্যে জোটেনি। (কাসাসুল কোরআন, ৬/১৭)
তবে সুলাইমানকেও (আ.) আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন সময় পরীক্ষা করেছেন। এর মধ্যে একটা পরীক্ষার ব্যাপারে কোরআনে এভাবে ইশারা দেওয়া হয়েছে :
আর আমি তো সুলাইমানকে পরীক্ষা করেছিলাম এবং তার সিংহাসনের উপর রেখেছিলাম একটি দেহ, অতঃপর সে আমার অভিমুখী হলো। (সুরা সোয়াদ : ৩৪)
কোরআনে স্পষ্ট করে বলা হয়নি কী পরীক্ষা করা হয়েছিল। তাই এই আয়াত কেন্দ্র করে অনেক ইসরাইলি বর্ণনা প্রচলিত আছে। এর মধ্যে প্রসিদ্ধ হলো সুলাইমানের (আ.) আংটি চুরি হওয়ার গল্প। তাফসিরে তাবারিতে কাহিনিটা এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে :
সুলাইমানের (আ.) একশত স্ত্রী ছিলেন। তাদের মধ্যে জারাদাহ নামের এক স্ত্রী ছিলেন সবচেয়ে প্রিয় ও বিশ্বস্ত। সুলাইমান (আ.) যখন গোসল ফরজ অবস্থায় থাকতেন কিংবা শৌচাগারে যেতেন, তখন তার আংটিটি খুলে রাখতেন এবং জারাদাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে তা আমানত রাখতেন না।
আরও পড়ুন
সুলাইমান (আ.) ও পিঁপড়ার গল্প, ক্ষুদ্র জীবের মহোত্তম পাঠ
একদিন জারাদাহ এসে বললেন, ‘আমার ভাইয়ের সঙ্গে অমুক ব্যক্তির একটি বিচার চলছে। আপনি যখন দরবারে বসবেন, আমি চাই সিদ্ধান্তটি যেন আমার ভাইয়ের পক্ষেই দেন।’ সুলাইমান (আ.) বললেন, ‘হ্যাঁ।’ যদিও তিনি বাস্তবে কোনো পক্ষপাতমূলক বিচার করেননি, তবু এই ইচ্ছার কারণেই তিনি পরীক্ষায় পড়েন।
তিনি আংটিটি জারাদাহর কাছে রেখে শৌচাগারে প্রবেশ করলেন। তখন ‘আসেফ’ নামক এক শয়তান সুলাইমানের (আ.) রূপ ধরে এসে আংটিটি চাইল জারাদাহর কাছে। জারাদাহ তা দিয়ে দিলেন। শয়তান আংটি পরে সিংহাসনে বসে গেল। এভাবে সে চল্লিশ দিন শাসন পরিচালনা ও বিচার-আচার করল।
তার বিচারপদ্ধতি দেখে বনি ইসরাইলের আলেম ও পণ্ডিতগ্ণ সন্দেহ করলেন। তারা তাওরাত পাঠ করতে শুরু করলে শয়তান আংটিসহ উড়ে সমুদ্রে চলে গেল। সেখানে আংটিটি পানিতে পড়ে যায় এবং একটি মাছ তা গিলে ফেলে।
অন্যদিকে, সুলাইমান (আ.) অনাহারে ঘুরতে ঘুরতে একদল জেলের কাছে পৌঁছলেন। তিনি কিছু মাছ খেতে চেয়ে বললেন, ‘আমি সুলাইমান।’ এক জেলে তাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করল। তার মাথা ফেটে রক্ত বের হতে লাগল। অন্য জেলেরা প্রহারকারী লোকটিকে তিরস্কার করে বলল, ‘তুমি লোকটিকে মেরে খুব খারাপ কাজ করলে!’ লোকটি বলল, ‘সে নিজেকে সুলাইমান বলে দাবি করছিল!’
এরপর জেলেরা তাকে পচে যাওয়া বা নষ্ট হতে যাওয়া দুটি মাছ দিল। সুলাইমান (আ.) আঘাতের ব্যথায় বিচলিত না হয়ে সমুদ্রের তীরে গিয়ে মাছ দুটির পেট কাটলেন ও ধুতে লাগলেন...। হঠাৎ তিনি একটি মাছের পেটের ভেতর তাঁর হারিয়ে যাওয়া আংটিটি পেয়ে গেলেন! তিনি তা আঙুলে পরিধান করলেন। সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তাঁর সৌন্দর্য, জ্যোতি ও রাজত্ব ফিরিয়ে দিলেন। আকাশে পাখিরা এসে তার ওপর ছায়া মেলল।
জেলেরা তাকে চিনতে পেরে ক্ষমা চাইল। সুলাইমান (আ.) বললেন, ‘আমি তোমাদের প্রশংসাও করব না, আবার দোষও দেব না; কারণ এই ঘটনা ঘটাই নির্ধারিত ছিল।’
একই ঘটনা ইসরাইলি সূত্রে কিছুটা ভিন্নভাবেও এসেছে। যেমন তালমুদে আছে :
হজরত সুলাইমান (আ.) বাইতুল মুকাদ্দাস নির্মাণের সময় আশমেদাই নামের এক জিনকে নিজের কাছে রেখেছিলেন। একদিন তিনি আশমেদাইকে বললেন, ‘আমরা জানি, ফেরেশতাদের মতো জিনদেরও বিশেষ শক্তি দেওয়া হয়েছে। বলো তো, তোমাদের এমন কী শক্তি আছে?’
আশমেদাই বলল, ‘আমার এই শিকলটি খুলে দিন এবং আপনার আংটিটি আমাকে দিন। তাহলেই আমি আপনাকে আমার শক্তি দেখাব।’
সুলাইমান (আ.) তার শিকল খুলে দিলেন এবং নিজের আংটি তাকে দিলেন। আশমেদাই আংটিটি গিলে ফেলল। মুহূর্তেই সে এমন বিশাল আকার ধারণ করল যে, তার এক ডানা ছিল জমিনে অন্য ডানা আকাশে। এরপর সে সুলাইমানকে (আ.) চারশ মাইল দূরে ছুড়ে ফেলল এবং তার সিংহাসনে বসে গেল।
সুলাইমান (আ.) তখন মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। তিনি বলতেন, ‘আমি সেই ইকলিজিয়াস্তেস, যে জেরুসালেমে ইসরাইলের বাদশাহ ছিলাম।’ এক সময় তিনি শাহি মহল, অর্থাৎ সানহেদ্রিনের কাছে পৌঁছালেন। তার কথা শুনে আলেমদের সন্দেহ হলো ‘এ লোকটি কি সত্যিই সুলাইমান? একজন পাগল তো একেক সময় একেক কথা বলে, কিন্তু এই লোকটি সব সময় একই কথা বলছে কেন?’
তারা সেনাপতি বনায়াহুকে জিজ্ঞাসা করলেন: ‘বাদশাহ কি আপনাকে ডেকেছেন?’ তিনি বললেন: ‘না।’ তারা রানিদের কাছে বার্তা পাঠালেন: ‘বাদশাহ কি আপনাদের কাছে আসেন?’ রানিরা উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ।’ তারা রানিদের বললেন, ‘বাদশাহর পা পরীক্ষা করে দেখুন (কারণ জিনের পা মানুষের মতো হয় না)।’ রানিরা জানালেন, ‘তিনি সবসময় মোজা পরে আসেন, তাই পা দেখা যায় না। তাছাড়া তিনি নারীদের অপবিত্রতার (ঋতুস্রাব) সময়েও জোর করেন এবং নিজের মা বাতশেবার কাছেও কুপ্রস্তাব নিয়ে যান।’
তারপর তারা বুঝতে পারলেন, এই ব্যক্তি আসল সুলাইমান নন। তারা সত্যিকারের সুলাইমানকে (আ.) খুঁজে বের করে তার হাতে সেই আংটি ও শিকল দিলেন। সুলাইমান (আ.) নিজের দরবারে প্রবেশ করতেই আশমেদাই তাকে দেখে পালিয়ে গেল। (তালমুদ, গিত্তিন-৬৮বি, ১৪-১৯, উইলিয়াম ডেভিডসন এডিশন)
এই ঘটনার ব্যাপারে প্রখ্যাত মুফাসসির ইবনে কাসির (রহ.) মন্তব্য করেন:
ইবনে জারির তাবারি, ইবনে আবি হাতিম এবং অন্যান্য মুফাসসিরগণ এ বিষয়ে পূর্বসূরিদের একটি বড় দলের সূত্রে অনেক ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তবে এসব বর্ণনার অধিকাংশ, এমনকি সবগুলোই ইসরাইলি বর্ণনা থেকে গৃহীত। আর এসব বর্ণনার অনেকগুলোর মধ্যেই গুরুতর অসংগতি ও অগ্রহণযোগ্য বিষয় বিদ্যমান রয়েছে। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ২/২৬)
আরও পড়ুন
হজরত সুলাইমানের (আ.) প্রজ্ঞাপূর্ণ বিচার
সব ধরনের ইসরাইলি বর্ণনার ব্যাপারে আলেমগণের সিদ্ধান্ত হলো, ‘কোরআনের সাথে সাংঘর্ষিক হলে অবশ্যই ইসরাইলি বর্ণনা গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। আর যদি সাংঘর্ষিক না হয়, সে ক্ষেত্রে আমরা একে সত্যও বলব না, আবার মিথ্যাও বলব না। বরং চুপ থাকব।’
তবে উল্লিখিত সুলাইমানের (আ.) আংটি চুরি যাওয়ার ঘটনা সতর্কতার খাতিরে না বলাই উত্তম। এবং আল্লাহ তাআলা কোরআনে যতটুকু বলেছেন, তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিৎ। কেননা, ঘটনা যদি মিথ্যা হয়, তাহলে একজন নবীর নামে মিথ্যা বলা হবে। আর সত্য হলেও আল্লাহ তাআলা ও রাসুল (সা.) যেহেতু তা আমাদের জন্য বিস্তারিত বলেননি, তার মানে এই ঘটনা জানার ও চর্চা করার প্রয়োজনও আমাদের নেই।
ওএফএফ
বিজ্ঞাপন