জাতীয়

ইতিবাচক চিন্তাই হোক সমাজ বদলের শক্তি

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
এ ইউ দৌলা শিরোনামের প্রশ্নটি অনেকের কাছেই হয়তো অদ্ভুত বলে মনে হতে পারে। মনের আবার খাবার হয় নাকি? খাবার তো কেবল শরীরের প্রয়োজন। কথাটি সত্য। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন তো অক্সিজেনের কথা, আমরা সারাদিন এই বর্ণহীন, গন্ধহীন গ্যাসের মধ্যে ডুবে আছি। আসলে ডুবে আছি বলেই বেঁচে আছি; প্রতি মুহূর্তে এই গ্যাস আমাদের ফুসফুসে প্রবেশ করছে বলেই আমরা জীবন্ত। পানির পিপাসা পেলে একটু কষ্ট করে আধঘণ্টা অপেক্ষা করা যায়, ক্ষুধা লাগলে এক ঘণ্টা পরেও খাবার খাওয়া সম্ভব; কিন্তু অক্সিজেন ছাড়া দুই মিনিট কাটানো কি সম্ভব? অথচ অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আমরা অক্সিজেনের কথা মনে রাখি না। মনের খাবারও ঠিক তেমনই। আক্ষরিক অর্থেই আমরা মনের অফুরন্ত খাবারের মধ্যে ডুবে আছি, কিন্তু তার অস্তিত্ব বুঝতে পারছি না। প্রিয় পাঠক, এবার আপনার কাছে একটি প্রশ্ন— যদি এমন হতো, এই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ একে অন্যকে সম্মান করছে? সকলেই সকলের জীবন, সম্মান আর অধিকার রক্ষা করছে? যদি এমন হতো যে সবাই কেবল ভালো আচরণ করছে, ভালো কথা বলছে, তাহলে এই জগৎটা কেমন হতো? যারা নানা পদ্ধতিতে মানুষের ব্যক্তিগত সমালোচনা করে সমাজে বিভেদ তৈরি করছেন, যারা অশোভন আচরণকে স্বাভাবিক করে তুলছেন, তাদের ট্র্যাপ থেকে সতর্ক থাকতে হবে। আপনার কান ও চোখকে কী ধরনের খোরাক দিচ্ছেন, তা বিচক্ষণতার সঙ্গে আপনাকেই বেছে নিতে হবে। তাই কোনো কিছু দেখার আগে, কোনো কিছু শোনার আগে একটু থামুন, নিজেকে প্রশ্ন করুন, নিজের মনকে আপনি কী খাওয়াচ্ছেন—পুষ্টি নাকি বিষ? আপনি নিশ্চয়ই এমন একটি সুন্দর পৃথিবীর কল্পনা করেছেন; হয়তো এমন একটি পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন আপনার মনের গভীরে লুকিয়ে আছে। আমার এই অনুমান যদি সত্যি হয়, তবে আপনাকে সেই কল্পিত জগতকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সহজ বৈজ্ঞানিক একটি পথ দেখাতে চাই। খুব সাধারণ একটি উদাহরণ দিয়ে শুরু করা যাক। আমরা জানি, যে খাবার বা পানীয় আমরা গ্রহণ করি, তা হজমের মাধ্যমে আমাদের শরীরে পুষ্টি যোগায়। খাবারের প্রতিটি মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট বা পুষ্টি উপাদান আমাদের দেহের প্রতিটি কোষে পৌঁছে শরীর গঠন করে। আবার আমরা এও খুব ভালো করে জানি, খাবারে যদি সামান্য পরিমাণেও বিষাক্ত কিছু থাকে, তবে তা আমাদের শরীরকে হয় তাৎক্ষণিকভাবে, নয়তো তিলে তিলে ধ্বংস করে দেয়। ব্যাপারটি জলের মতো স্পষ্ট। কিন্তু ঠিক এই রকমই জলের মতো স্পষ্ট আরেকটি সত্য রয়েছে, যা আমরা প্রায়ই ভুলে থাকি। সেটি হলো, আমরা প্রতিদিন যে শব্দগুলো শুনি, যে দৃশ্যগুলো দেখি, তার প্রতিটির মাঝেই লুকিয়ে থাকে আমাদের মন ও মস্তিষ্কের মূল উপাদান। আমরা যা কিছু ভালো দৃশ্য দেখি, তা আমাদের মনকে ভালোর শক্তিতে মজবুত করে। আর যা কিছু মন্দ দৃশ্য দেখি বা মন্দ কথা শুনি, তা আমাদের মনকে ধীরে ধীরে বিষাক্ত করে তোলে। বিজ্ঞান বলছে, মানুষের ব্রেইন হলো জগতের সবচেয়ে জটিল বায়োলজিক্যাল মেশিন। এই মেশিন যা কিছু দেখে বা শোনে, তার সবই সে জমা করে। তথ্য জমা করার সময় ব্রেইন কিন্তু ভালো বা মন্দ, পুষ্টি বা বিষ—বাছাবাছি করে না। সে কেবল অন্ধের মতো জমা করতে থাকে; আর সেই জমা হওয়া তথ্য থেকেই সৃষ্টি হয় ব্যক্তির আচরণ, মনোভাব ও ব্যক্তিত্ব। এখন দেখুন, আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই বা টেলিভিশনের পর্দায় তাকালে আমরা কী দেখতে পাই? ধরুন, কোনো একটি জনপ্রিয় টক শো চলছে। সেখানে প্রায়ই দেখা যায়, তারা শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করে একে অপরের দিকে কুৎসিত ব্যক্তিগত আক্রমণ ছুড়ে দিচ্ছেন। কিংবা ধরুন, এমন কোনো সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার, যাকে লাখ লাখ তরুণ-তরুণী অনুসরণ করেন, সেই তিনি তাঁর কোনো ভিডিওতে অত্যন্ত অসভ্য ও নোংরা ভাষা ব্যবহার করছেন। আবেগপ্রবণ হয়ে হয়তো তিনি সেটা করছেন, মানুষের যন্ত্রণা ও দুর্ভোগ আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার অছিলায় কিংবা ভিডিওর ভিউ বাড়ানোর জন্য হয়তো সেটি করছেন। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন কি, মুহূর্তের উত্তেজনায় কিংবা বিনোদনের মোড়কে ছড়ানো এই অসভ্যতার দীর্ঘমেয়াদি ফল কী হচ্ছে? সেই নোংরা শব্দগুলো অত্যন্ত ধীরে ধীরে, তিল তিল করে সমগ্র প্রজন্মের অন্তরে বিষের বীজ বুনছে। তরুণ সমাজ ভাবছে, ‘যিনি এত বড় মাপের মানুষ, তিনিও যদি এভাবে কথা বলতে পারেন, তবে তো এটাই স্টাইল!’ আর এভাবেই সমাজে বিকৃতিগুলো স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। আমরা যখন কোনো মন্দ ঘটনার গল্প বলি, মন্দ বিষয়ের পোস্ট দিই, নোংরা গল্পগুলো বারবার তুলে ধরি কিংবা মন্দের প্রচার চালাই, তখন আসলে আমাদের মস্তিষ্কে কী ঘটে? ধরুন, পচা ময়লার একটি মুখবন্ধ বস্তা। সেই বস্তার মুখ বন্ধ করে নিরাপদে সরিয়ে রাখার বদলে যদি আপনি ছুরি-কাঁচি দিয়ে সেই বস্তাটি কেটে ছিন্নভিন্ন করে দেন, তবে কী পাবেন? আপনি পাবেন তীব্র দুর্গন্ধ, মারাত্মক পরিবেশদূষণ এবং সেই দূষণে আপনিসহ আপনার আশপাশের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়বেন। মন্দ কথার প্রচার এভাবেই ক্রিয়া করে। মন্দের প্রচার মন্দকেই উসকে দেয়, আর ভালোর প্রচার টানে ভালোর দিকে। আমাদের মনের ইঞ্জিনিয়ারিং এভাবেই কাজ করে—আমরা যা কিছু বারবার শুনি বা দেখি, যা কিছু আমরা বারবার অনুভব করতে অভ্যস্ত হই, আমাদের আচরণ ঠিক তেমনই হয়ে ওঠে। আপনি হয়তো জেনে থাকবেন, চীন তাদের দেশের বড় বড় বিলবোর্ডগুলোতে দেশের সেরা বিজ্ঞানীদের ছবি টাঙিয়ে দিয়েছে এবং সেরা বিজ্ঞানীদেরই তারা রাষ্ট্রের সেলিব্রিটি আখ্যা দিচ্ছে। কেন? যেন শিশুরা সেই সব বিজ্ঞানীদের দেখে, তাঁদের চিন্তাকে ধারণ করে এবং নিজেদের অন্তরে বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন বোনে। তাদের আজকের এই দূরদর্শী বিনিয়োগ কি আগামীকালই ফল দেবে? না, এটি আজ থেকে ৩০–৪০ বছর পর এক বিশাল শক্তির উৎস হয়ে উঠবে। কী বলছি, কী শুনছি, কী দেখছি আর কী সব দৃশ্যের প্রচার করছি—সে বিষয়ে দূরদর্শিতার চর্চা না থাকলে কোনো জাতি কি কখনো সম্মানিত জাতিতে পরিণত হতে পারে? প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে সমাজে কোনো অনিয়ম দেখলে কি আমরা মুখ বুজে থাকব? কোনো সমালোচনা কি করা যাবে না? অবশ্যই সমালোচনা করা যাবে, সমালোচনা ছাড়া সমাজ কখনো এগিয়ে যেতে পারে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই সমালোচনার ধরনটা কেমন হবে? আমাদের সমালোচনা হতে হবে ব্যক্তিকে আক্রমণ না করে, পদ্ধতি বা নীতির সমালোচনা। ধরুন, রাষ্ট্রে বা সমাজে কোনো ভুল নীতি বা অন্যায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। কিন্তু সমালোচনা যদি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি করা হয়, তবে তা কেবল বিভেদই তৈরি করবে। এর পরিবর্তে সমালোচনা যদি হয় সেই ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতির বিরুদ্ধে, তবে সেই আলোচনা নীতিনির্ধারকদের বাধ্য করবে ভুল শুধরে নিতে। পদ্ধতির সমালোচনা সব সময় সংস্কার ও উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করবে, আর ব্যক্তিগত আক্রমণ কেবল পরিবেশ ও সমাজকেই বিষাক্ত করবে। প্রতিটি বক্তব্য, সংবাদ, গল্প, কবিতা, পোস্ট, নিবন্ধ বা দৃশ্য—সবকিছুর মাঝেই রয়েছে ‘পুষ্টি’ নয়তো ‘বিষ’, যা প্রতিনিয়ত আমাদের মনের গঠন ও আচরণকে প্রভাবিত করে চলেছে। প্রতিদিনের দেখা দৃশ্য থেকে মনের গঠন, মনের গঠন থেকে ব্যক্তিগত আচরণ, আর আমাদের আচরণ থেকেই জন্ম নেয় সম্মান কিংবা অসম্মান। তাই কোনো জাতির পাসপোর্ট যদি বিশ্বদরবারে সম্মানিত পাসপোর্ট না হয়, তবে তা অন্য কারও দোষ নয়; এটি সেই জাতির সামগ্রিক আচরণেরই অর্জন। মনোবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, আমাদের ব্রেইন প্রতি মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে যে শব্দটি আপনার মাথায় প্রবেশ করল, তা আপনার ব্রেইনের নিউরাল নেটওয়ার্ককে অতি ক্ষুদ্র লেভেলে হলেও বদলে দিয়েছে! নিউরোসায়েন্সের গবেষণা বলছে, এক মুহূর্ত আগে আপনি যে মানুষটি ছিলেন, এখন আপনি ঠিক একই মানুষ নন। অতি ক্ষুদ্র হলেও আপনার ভেতরে পরিবর্তন ঘটেছে; আর এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরিবর্তনগুলোই একটু একটু করে বৃহৎ রূপ নেয়। এটা ঠিক যেমন এক বিন্দু জল—একটি জলের বিন্দু একা মূল্যহীন হলেও, হাজারো সেই বিন্দু যুক্ত হয়ে একসময় সৃষ্টি করে বিশাল মহাসমুদ্র। এখানে ইসলাম ধর্মের একটি অত্যন্ত মূল্যবান শিক্ষা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। মানুষদের সম্পর্কে কটু কথা বলা, অন্যের সমালোচনা করা, মন্দ কথার চর্চা করা বা মন্দের প্রচার করাকে ইসলাম ধর্মে অন্যতম ঘৃণিত পাপ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। শিরকের পরেই সবচেয়ে জঘন্য পাপ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে গীবত বা পরনিন্দাকে। এক সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘যার সম্পর্কে মন্দ কথা বলা হচ্ছে, সেই মন্দ যদি সত্যিই ব্যক্তির মধ্যে থাকে, তবে কি সেটা গীবত হবে?’ মহানবী (সা.) বললেন, হ্যাঁ, সেটাই গীবত। আসলে যেকোনো ধরনের মন্দ কথা বলা, মন্দের প্রচার করা বা মন্দের আলোচনা মানবসমাজে বিষের বিস্তার ঘটায় বলেই ইসলাম ধর্মে তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সচেতন হওয়া দরকার। যারা নানা পদ্ধতিতে মানুষের ব্যক্তিগত সমালোচনা করে সমাজে বিভেদ তৈরি করছেন, যারা অশোভন আচরণকে স্বাভাবিক করে তুলছেন, তাদের ট্র্যাপ থেকে সতর্ক থাকতে হবে। আপনার কান ও চোখকে কী ধরনের খোরাক দিচ্ছেন, তা বিচক্ষণতার সঙ্গে আপনাকেই বেছে নিতে হবে। তাই কোনো কিছু দেখার আগে, কোনো কিছু শোনার আগে একটু থামুন, নিজেকে প্রশ্ন করুন, নিজের মনকে আপনি কী খাওয়াচ্ছেন—পুষ্টি নাকি বিষ? লেখক : মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক। এইচআর/এএসএম
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>