ব্রেকিং নিউজ
প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে চাকরি পেলেন আজন্ম দৃষ্টিহীন রাবি শিক্ষার্থী ঢাবিতে ককটেল বিস্ফোরণের প্রতিবাদে ছাত্রদলের বিক্ষোভ উপনির্বাচন ঘিরে উত্তপ্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি, নন্দীগ্রাম-রেজিনগরে প্রার্থী ঘোষণা ডেঙ্গুতে আরও ৭ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১৫৯৩ স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রশ্নে ইসি ও সরকারের সমন্বয়হীনতা প্রকাশ্যে কাদেরসহ ৭ নেতার মৃত্যুদণ্ড, ৫ জনের অর্ধেক সম্পদ বাজেয়াপ্ত ঢাবিতে পরপর তিন ককটেল বিস্ফোরণ আসিফ নজরুল: বিশ্বকাপ বয়কটের দায় আমারই আগামী বর্ষায় ঢাকায় আর রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি হবে না ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি: জড়িতদের শাস্তির দাবি শিক্ষক নেটওয়ার্কের
জাতীয়

কাদেরসহ ৭ নেতার মৃত্যুদণ্ড, ৫ জনের অর্ধেক সম্পদ বাজেয়াপ্ত

P
Prothom Alo অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার রায়ে ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষস্থানীয় সাত নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই সাজা দেওয়া হয়েছে ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’র (শীর্ষ নেতৃত্বের দায়) দায়ে।

আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের দণ্ডিত পাঁচ নেতার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার আদেশও দেওয়া হয়েছে। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিতরণ করা হবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের মধ্যে। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গতকাল মঙ্গলবার এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় গত বছরের ১৭ নভেম্বর আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভাপতি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

১০ মাস পর আরেকটি মামলায় গতকাল দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্যরা হলেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এবং সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত। বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খানকে এবং ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানকেও মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত এই সাত আসামিই পলাতক। তাঁদের মধ্যে ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খানের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেওয়া হয়েছে।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়। এসব অপরাধের ঘটনায় সপ্তম রায় হলো গতকাল।

দুটি ট্রাইব্যুনালের ৭টি রায়ে ৬৮ আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই ২২ আসামির মধ্যে ১৮ জন পলাতক। কারাগারে আছেন চারজন।

রায়ের আগে যা বললেন ট্রাইব্যুনাল

তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল গতকাল বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে এজলাসে আসেন। পরে কয়েকটি মামলার শুনানি করেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে করা মামলার রায় ঘোষণা শুরু হয়।

ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী রায় ঘোষণার শুরুতে বলেন, এই মামলার অনেক কাগজ। তাঁদের পড়তে কষ্ট হয়েছে। রায় দিতে কষ্ট হয়েছে। প্রসিকিউশনেরও কম কষ্ট হয়নি। সাক্ষীরাও কষ্ট করেছেন। তদন্ত কর্মকর্তা অবর্ণনীয় পরিশ্রম করেছেন। সাংবাদিকেরাও সহযোগিতা করেছেন। সবাইকে ধন্যবাদ।

বিচারপতি নজরুল ইসলাম বলেন, রায়ের কপি ৫৫০ পৃষ্ঠার বেশি। পৃষ্ঠা আরও বাড়বে। পুরো রায় ইংরেজিতে। তবে সহজে বোঝার জন্য এর কিছু অংশ বাংলা করে আনা হয়েছে। তিনি বলেন, তাঁদের পুরো রায় পড়া উচিত ছিল। আসামিরা উপস্থিত থাকলে পড়ে শোনাতেন। এরপর আসামিদের কার কী সাজা, তা ঘোষণা করেন তিনি।

কী অপরাধ, কী সাজা

ওবায়দুল কাদের

এই মামলার রায়ে প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে চারটি করে অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগের সব কটিতেই তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। চারটি অভিযোগের তিনটিতে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একটিতে (দুই নম্বর অভিযোগ) দেওয়া হয়েছে আমৃত্যু কারাদণ্ড।

প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১১ জুলাই বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের মুঠোফোনে কথোপকথন হয়। আন্দোলন দমনের সরাসরি নির্দেশ দিয়ে সাদ্দামকে তখন কাদের বলেছিলেন, ‘মারো না কেন ওদের, প্রশ্রয় দাও কেন?’

১৫ জুলাই ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ সভাপতির দলীয় কার্যালয়ে ওবায়দুল কাদের সংবাদ সম্মেলনে ‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’ বলে বক্তব্য দেন। এ বক্তব্যের মাধ্যমে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দেন ওবায়দুল কাদের।

ওবায়দুল কাদেরের এমন নির্দেশনার পর ১৬ জুলাই আওয়ামী সন্ত্রাসীরা গুলি করে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানার মুরাদপুর এলাকায় মোহাম্মদ ওয়াসিম, ফয়সাল আহম্মেদ শান্ত ও মো. ফারুককে হত্যা করে। একই দিন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ সারা দেশে ছয়জন নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়। এর জন্য তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

দুই নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই রাজধানীর তেজগাঁওয়ের দলীয় কার্যালয়ে নেতা–কর্মীদের নিজ নিজ এলাকায় প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের।

পরদিন ১৮ জুলাই ধানমন্ডির আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ আন্দোলনকে সরকারবিরোধী ও ষড়যন্ত্রমূলক আখ্যা দেন ওবায়দুল কাদের।

১৯ জুলাই গণভবনে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের প্রধানদের বৈঠক শেষে কারফিউ জারি ও সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘এটা অবশ্যই কারফিউ, সেটা শুট অ্যাট সাইট হবে।’

ওবায়দুল কাদেরের এসব নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা গুলি করে মিরপুরে ১৮ জুলাই শেখ শাহরিয়ার বিন মতিনসহ ৩ জন, ১৯ জুলাই আসিফ ইকবালসহ ৩০ জন, ২০ জুলাই সিফাত হোসেন, মহাখালী এলাকায় ৬ জনসহ সারা দেশে অসংখ্য আন্দোলনকারীকে হত্যা করে।

তিন নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ওবায়দুল কাদের এক সংবাদ সম্মেলনে পাড়া-মহল্লায় অবস্থান নিয়ে আন্দোলনকে রুখে দিতে দলের নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেন। তাঁর

এই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা গুলি করে মিরপুরে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট শাহরিয়ার হাসান আলভী, মিরাজ ফরাজি, মহিউদ্দিনসহ ১২ জনকে, ফেনীর মহিপালে ইশতিয়াক আহাম্মেদসহ ৭ জনকে এবং লক্ষ্মীপুর সদরে সাদ-আল আফনানসহ ৪ জনকে হত্যা করে। একইভাবে ৫ আগস্ট মিরপুরে মাহফুজুল আলমসহ ২০ জনকে এবং রাজশাহী মহানগরে রায়হান আলী, সাকিব আনজুমসহ সারা দেশে অসংখ্য আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়।

চার নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ওবায়দুল কাদেরের নিয়ন্ত্রণ ছিল। তারপরও তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন প্রতিরোধ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

বাহাউদ্দিন নাছিম

বাহাউদ্দিন নাছিমের বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগের মধ্যে একটি (দুই নম্বর অভিযোগ) থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়েছে। খালাস পাওয়া অভিযোগটি হলো, নাছিমের নিজ জেলা মাদারীপুরে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনে সাবেক মেয়র খালিদ হোসেনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক তদারক করতেন তিনি। সেখানে ১৮ জুলাই দীপ্ত দে এবং ১৯ জুলাই তৌহিদকে হত্যা এবং অসংখ্য আন্দোলনকারীকে গুরুতর জখম করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছত্রচ্ছায়ায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের ক্যাডাররা।

তিন ও চার নম্বর অভিযোগে বাহাউদ্দিন নাছিমকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে নাছিমের প্ররোচনায় ৪ আগস্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী সন্ত্রাসীরা আসামির নির্বাচনী এলাকা বাংলামোটরে তিনজনকে এবং পল্টন নাইটিঙ্গেল মোড়ে একজনকে হত্যা করে। পরদিন ৫ আগস্ট ঢাকা মেডিকেলের সামনে রাকিব হোসেনসহ গুলিস্তান, বাংলামোটর ও চানখাঁরপুল এলাকায় মোট ১৩ জনকে হত্যা করে।

এক নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় নাছিমকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তিনি ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে অপরাধ সংঘটনে সমর্থন ও প্ররোচনা দেন।

মোহাম্মদ আলী আরাফাত

সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগের মধ্যে একটিতে (তিন নম্বর অভিযোগ) খালাস দেওয়া হয়েছে। তিন নম্বর অভিযোগে আরাফাতের বিরুদ্ধে ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজের’ (যৌথ অপরাধমূলক উদ্যোগ) অভিযোগ আনা হয়েছিল।

দুই নম্বর অভিযোগে আরাফাতকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এক ও চার নম্বর অভিযোগে তাঁকে দেওয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ড। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই দিবাগত রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গিয়ে আরাফাত বিভিন্ন রকম উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। ১৯ জুলাই আরাফাত প্রেস ব্রিফিংয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের সন্ত্রাসী তকমা দেন। পাশাপাশি তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টানা পাঁচ বছর অস্ত্র-গুলি ব্যবহার করার মতো মজুতের বিষয় উল্লেখ করে হুমকি দেন। তাঁর নির্বাচনী এলাকায় ১৯ জুলাই হামলা চালিয়ে মো. শাহজাহান, গনি মিয়াসহ ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা করে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ অন্যান্য দলীয় সশস্ত্র ক্যাডাররা। এই হত্যাকাণ্ডের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন আরাফাত।

শেখ ফজলে শামস পরশ

যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশের বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগের একটিতে (এক নম্বর অভিযোগ) তাঁকে খালাস দেওয়া হয়েছে। এক নম্বর অভিযোগে পরশের বিরুদ্ধে জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজের (যৌথ অপরাধমূলক উদ্যোগ) অভিযোগ আনা হয়েছিল।

পরশকে দুই নম্বর অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং তিন ও চার নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এসব অভিযোগের মধ্যে আছে শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশনা মোতাবেক সারা দেশে আন্দোলন নস্যাতের জন্য পরশ যুবলীগকে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন। তাঁর নির্দেশে যুবলীগের নেতা-কর্মীরা সশস্ত্র অবস্থায় দেশের বিভিন্ন স্থানে আগ্নেয়াস্ত্র, দেশি অস্ত্রসহ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালিয়ে নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে হত্যা ও গুরুতর আহত করে।

মাইনুল হোসেন খান নিখিল

যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল চারটি অভিযোগেই দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। এক নম্বর অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং দুই, তিন ও চার নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশ ও প্ররোচনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯ জুলাই মাইনুল নিজে অস্ত্র হাতে নিয়ে মিরপুর এলাকায় মহড়া দেন। সেদিন তাঁর নেতৃত্ব ও নির্দেশে মিরপুরে নির্বিচার গুলি চালিয়ে রুস্তম, আসিফ ইকবালসহ ২৬ জনকে হত্যা করা হয়।

সাদ্দাম হোসেন

ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন চারটি অভিযোগেই দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। এক ও দুই নম্বর অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং তিন ও চার নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে রয়েছে তিনি ১৫ জুলাই ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবে’ বলে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ১৮ জুলাই নির্বিচার গুলি করে, যাতে সারা দেশে ২৩ জন নিহত হন।

শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান

ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগের সব কটিতেই তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। এক ও দুই নম্বর অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং তিন ও চার নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ইনান শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রতিহত করার জন্য নির্দেশ দেন। তাঁর নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ছাত্রলীগের কমিটি, ঢাকা কলেজের কমিটির সদস্যরা হামলা চালান। ১৬ জুলাই সারা দেশে ছয়জন নিহত হন।

রায়ে বলা হয়, ওবায়দুল কাদের ছাড়াও দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিদের নিজ সংগঠন ও দল এবং সরকারে নিয়ন্ত্রণ ছিল। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য হিসেবে দল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নাছিমের নিয়ন্ত্রণ ছিল। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আওয়ামী লীগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গণমাধ্যমের ওপর আরাফাতের নিয়ন্ত্রণ ছিল।

যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ এবং সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের তাঁদের সংগঠনের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল। একইভাবে সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের নিয়ন্ত্রণ ছিল ছাত্রলীগের ওপরেও।

রায়ে বলা হয়, নিজ সংগঠন ও দল এবং সরকারে নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও এই সাত আসামি গণ-অভ্যুত্থানের সময় নেতা-কর্মীদের অপরাধ থেকে বিরত রাখতে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন। এই অভিযোগে প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এটি সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটির দায়।

‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি ও ব্যক্তিগত দায়’

সাত আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায়ে শুকরিয়া আদায় করেছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। রায় ঘোষণার পর নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এই মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ ছিল। তাঁদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত দায়ও ছিল।

ব্রিফিংয়ে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, আসামিদের অনুপস্থিতিতে বিচার নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন উদ্বেগ জানিয়েছে। জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, কোনো অপরাধী যদি ইচ্ছাকৃতভাবে পলাতক থাকে, আইনে যেভাবে বিধান আছে, সেভাবেই বিচারকার্য পরিচালিত হয়েছে। অতএব এখানে কোনো মানবাধিকার সংগঠনের মন্তব্যের অবকাশ নেই।

চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, রায় প্রকাশিত হওয়ার ৩০ দিন পর্যন্ত আপিল করার সুযোগ থাকবে। এর মধ্যে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার সুযোগ নেই। আপিল না হলে রায় বাস্তবায়ন করতে বাধা নেই।

ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন জুলাই শহীদ মেহেরুন্নেসা তানহার বাবা মোশারফ হোসেন এবং মামলার সাক্ষী রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশরাফ কায়সার ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক মাহিন সরকার। আসামিপক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী ছিলেন ইসরাত জাহান ও এম হাসান ইমাম। তাঁরা রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

৪৫৪ দিনে তদন্ত থেকে রায়

প্রসিকিউশন জানিয়েছে, ওবায়দুল কাদেরসহ এই মামলার দণ্ডিত সাত আসামির বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়েছিল গত বছরের ১৮ জুন। তদন্ত সংস্থা প্রতিবেদন দাখিল করে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর। পরে ১৮ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ)।

এরপর চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি এই মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। ১৭ ফেব্রুয়ারি সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। সেদিন সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। ২৮ এপ্রিল সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। ২৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ নেওয়া হয়েছে। গত ৫ আগস্ট যুক্তিতর্ক শুরু হয়। উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয় ১৭ আগস্ট। গতকাল রায় ঘোষণা করা হলো।

বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>