জাতীয়

চার দিনে চার আগুন: প্রশিক্ষিত মানুষটি কোথায়?

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সার্ভার রুমে আগুন। পরদিন উত্তরার সেন্টার পয়েন্টের ফুডকোর্টের রান্নাঘরে আগুন। এরপর ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে এপেক্স শোরুমে অগ্নিকাণ্ড। একই দিনে মহাখালীর BAT-এর একটি ভবনে গ্যাস কাটার ব্যবহারের সময় আগুন ছড়িয়ে পড়ার খবর। স্থান, স্থাপনা, কার্যক্রম ও ঝুঁকির ধরন ভিন্ন হলেও ঘটনাগুলোর বার্তা এক—আমাদের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোথাও গভীর বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। এই আগুনগুলো কি নিছক কাকতালীয় দুর্ঘটনা? নাকি এগুলো আমাদের প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ, তদারকি ও জবাবদিহির দুর্বলতার প্রকাশ? প্রতিটি ঘটনার কারণ পৃথক ও নিরপেক্ষ তদন্তে নির্ধারিত হতে হবে। তদন্তের আগে কোনো ঘটনাকে ‘শর্টসার্কিট’, ‘নাশকতা’ বা ‘মানবিক ভুল’ বলে চূড়ান্ত করা উচিত নয়। তবে একজন অগ্নিনিরাপত্তা পেশাজীবীর দৃষ্টিতে ঘটনাগুলো এমন কিছু মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে, যা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। রূপপুর: গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় একটি ছোট আগুনও বড় সতর্কবার্তা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্থাপনা। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একটি সার্ভার রুমে আগুনে কম্পিউটার, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও গুরুত্বপূর্ণ নথি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে আগুনটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো প্রভাব ফেলেছে কি না, তা কেবল দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কারিগরি তদন্তেই নির্ধারণ করা সম্ভব। তারপরও ঘটনাটি হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। একটি গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চনিরাপত্তাসম্পন্ন স্থাপনায় সার্ভার রুম শুধু কয়েকটি কম্পিউটার রাখার জায়গা নয়। এটি তথ্য, যোগাযোগ, নথি, নিয়ন্ত্রণ ও প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এমন কক্ষে সাধারণ স্মোক ডিটেক্টরের পাশাপাশি Very Early Smoke Detection, স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ম, উপযুক্ত ক্লিন-এজেন্ট নির্বাপণব্যবস্থা, অগ্নিরোধী কেবল, জরুরি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নকরণ, ফায়ার-রেটেড বিভাজন এবং নিরাপদ দূরবর্তী ডেটা ব্যাকআপ থাকা প্রয়োজন। কাছাকাছি ফায়ার স্টেশন এবং স্থাপনার নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকার পরও যদি আগুন একটি সার্ভার রুমে ব্যাপক ক্ষতি করে, তবে প্রশ্ন উঠবেই—আগুন শনাক্ত হতে কত সময় লেগেছে? অ্যালার্ম কি যথাসময়ে বেজেছিল? সংকেত পাওয়ার পর কে কী ব্যবস্থা নিয়েছিল? স্বয়ংক্রিয় নির্বাপণব্যবস্থা ছিল কি এবং থাকলে তা কাজ করেছে কি? কক্ষের অগ্নিরোধী দরজা বন্ধ ছিল কি? কেবল ট্রে বা দেয়ালের ফাঁক দিয়ে আগুন ও ধোঁয়া অন্য অংশে ছড়িয়েছে কি? জরুরি দল কত মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল? ঘটনাটি দুর্ঘটনা, প্রযুক্তিগত ত্রুটি, অবহেলা, নাকি উদ্দেশ্যমূলক কর্মকাণ্ড—তা অনুমান দিয়ে নয়, ফরেনসিক প্রমাণ দিয়ে নির্ধারিত হওয়া উচিত। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রবেশ-নিয়ন্ত্রণ রেকর্ড, ফায়ার অ্যালার্ম লগ, বৈদ্যুতিক ডেটা, ক্ষতিগ্রস্ত কেবল ও যন্ত্রাংশ এবং প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য সংরক্ষণ করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্থাপনার তদন্ত হতে হবে স্বাধীন, বহুবিষয়ক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। রূপপুরের ঘটনা আমাদের পুরোনো একটি সামরিক সত্য স্মরণ করিয়ে দেয়—শুধু অত্যাধুনিক বন্দুক থাকলেই প্রতিরক্ষা নিশ্চিত হয় না; বন্দুকের পেছনে প্রয়োজন প্রশিক্ষিত, সতর্ক, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সিদ্ধান্তক্ষম মানুষ। অগ্নিনিরাপত্তার ক্ষেত্রেও সরঞ্জামের পেছনে সেই মানুষটি কোথায়—এ প্রশ্ন এখন জরুরি। সেন্টার পয়েন্ট: নতুন ভবন মানেই নিরাপদ ভবন নয় উত্তরার সেন্টার পয়েন্ট একটি তুলনামূলক নতুন বাণিজ্যিক স্থাপনা। সেখানে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, ডিটেকশন ও অ্যালার্ম, স্প্রিংকলার এবং হাইড্র্যান্ট ব্যবস্থা থাকার কথা। তারপরও ফুডকোর্টের রান্নাঘরে শুরু হওয়া আগুন যদি নিজস্ব ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ করা না যায় এবং ফায়ার সার্ভিসকে এসে তা নেভাতে হয়, তবে ভবনের সামগ্রিক অগ্নিনিরাপত্তা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কমার্শিয়াল রান্নাঘর একটি বিশেষ অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ স্থান। এখানে খোলা শিখা, উচ্চ তাপমাত্রা, রান্নার তেল, এলপিজি বা গ্যাসলাইন, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি এবং হুড-ডাক্টে জমে থাকা চর্বি একই সঙ্গে উপস্থিত থাকে। সাধারণ ABC অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র সব ধরনের রান্নার তেলের আগুনে কার্যকর বা নিরাপদ নয়। এ ধরনের রান্নাঘরে উপযুক্ত Wet Chemical বা Class-K নির্বাপণব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় কিচেন হুড সাপ্রেশন, গ্যাস শাট-অফ ইন্টারলক, জরুরি বৈদ্যুতিক বিচ্ছিন্নকরণ এবং নিয়মিত হুড-ডাক্ট পরিষ্কার অপরিহার্য। প্রতিটি ফুড আউটলেটের কর্মীদের জানতে হবে—আগুন দেখলে কে অ্যালার্ম দেবে, কে গ্যাস বন্ধ করবে, কে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করবে, কে উপযুক্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ব্যবহার করবে এবং কে মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেবে। পৃথক দোকান, ফ্লোর ব্যবস্থাপনা এবং ভবনের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষের মধ্যে সমন্বিত Incident Command না থাকলে আধুনিক ভবনও কয়েক মিনিটে নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। স্প্রিংকলার হেড দেখা গেলেই ধরে নেওয়া যায় না যে ব্যবস্থা সচল। পানির রিজার্ভ পর্যাপ্ত কি না, পাম্প Auto Mode-এ আছে কি না, কন্ট্রোল ভালভ খোলা আছে কি না, প্রয়োজনীয় চাপ পাওয়া যাচ্ছে কি না এবং সর্বশেষ কবে Flow Test হয়েছে—এসবই কার্যকারিতার অংশ। নতুন ভবন নিরাপদ ভবনের সমার্থক নয়; পরীক্ষিত, রক্ষণাবেক্ষিত এবং দক্ষ জনবল দ্বারা পরিচালিত ভবনই নিরাপদ। এপেক্স শোরুম: একটি DB বোর্ড থেকে কত বড় আগুন হতে পারে? ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের এপেক্স শোরুমে আগুনের ঘটনা আবারও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বৈদ্যুতিক ও স্টোরেজ নিরাপত্তাকে সামনে এনেছে। প্রাথমিকভাবে DB বোর্ড বা বৈদ্যুতিক উৎসের কথা আলোচিত হলেও অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত উৎপত্তিস্থল এবং কারণ তদন্তে নিশ্চিত করতে হবে। একটি Distribution Board-এ আগুনের সম্ভাব্য কারণ হতে পারে ঢিলা টার্মিনাল, অতিরিক্ত লোড, ভুল রেটিংয়ের সার্কিট ব্রেকার, অসম লোড বণ্টন, নিম্নমানের কেবল, ক্ষতিগ্রস্ত ইনসুলেশন, ধুলা-আর্দ্রতা, অতিরিক্ত তাপ অথবা বৈদ্যুতিক আর্কিং। জুতার দোকান বা গুদামে কার্টন, ফোম, রাবার, সিনথেটিক উপাদান, আঠা ও প্লাস্টিক থাকায় ছোট আগুন দ্রুত উচ্চ তাপ এবং ঘন বিষাক্ত ধোঁয়া তৈরি করতে পারে। কর্মীরা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ব্যবহার করেও আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে শুধু কর্মীদের দায়ী করলেই হবে না। দেখতে হবে—তাঁরা বাস্তব প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন কি না; সঠিক ধরনের অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ছিল কি না; যন্ত্রে পর্যাপ্ত চাপ ছিল কি না; নিরাপত্তা সিল ও মেয়াদ ঠিক ছিল কি না; বৈদ্যুতিক সংযোগ বন্ধ করা হয়েছিল কি না; এবং আগুন শনাক্ত হওয়ার পর প্রথম তিন মিনিটে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ফায়ার এক্সটিংগুইশার দেয়ালে ঝোলানো অলংকার নয়। প্রশিক্ষণ ছাড়া আতঙ্কিত একজন কর্মীর হাতে এটি প্রায় অকার্যকর হয়ে যায়। আবার প্রশিক্ষিত কর্মীকেও বড় বা দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনের সামনে ঠেলে দেওয়া যাবে না। তাঁর প্রথম দায়িত্ব হবে অ্যালার্ম দেওয়া, মানুষকে সতর্ক করা, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করা এবং নিরাপদ পলায়নপথ নিশ্চিত করা। মহাখালীর BAT-এর: গ্যাস কাটার মানেই নিয়ন্ত্রিত ‘হট-ওয়ার্ক’ মহাখালীর BAT-এর ভবনে গ্যাস কাটার দিয়ে রড কাটার সময় আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকলে তা একটি গুরুতর Hot Work Management Failure-এর ইঙ্গিত দেয়। গ্যাস কাটিং, ওয়েল্ডিং বা গ্রাইন্ডিংয়ের স্ফুলিঙ্গ অনেক দূরে ছড়িয়ে লুকানো দাহ্য পদার্থ, পরিত্যক্ত আসবাব, ফোম, তারের ইনসুলেশন বা ধুলায় আগুন ধরাতে পারে। স্ফুলিঙ্গ সরু ফাঁক দিয়ে নিচের তলা বা অদৃশ্য স্থানে পৌঁছে ধীরে ধীরে আগুন সৃষ্টি করতে পারে। Hot Work কখনো মৌখিক অনুমতিতে করা উচিত নয়। লিখিত Hot Work Permit, কাজের স্থান পরিদর্শন, দাহ্য পদার্থ অপসারণ, ফায়ার ব্ল্যাঙ্কেট, গ্যাস সিলিন্ডারের নিরাপদ অবস্থান, উপযুক্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র এবং প্রশিক্ষিত Fire Watch থাকতে হবে। কাজ শেষ হওয়ার পরও নির্ধারিত সময় পর্যন্ত এলাকা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ভবন সংস্কারাধীন, পরিত্যক্ত বা ভাঙার অপেক্ষায় থাকলেও অগ্নিনিরাপত্তার দায়িত্ব বাতিল হয় না। ‘শর্টসার্কিট’ কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত-ফল নয় বাংলাদেশে আগুনের পর খুব দ্রুত বলা হয়—‘বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত’। কিন্তু শর্টসার্কিট বা আর্কিং কেন ঘটল, সেটিই প্রকৃত তদন্তের বিষয়। দায় এড়ানোর সুবিধাজনক শব্দ হিসেবে ‘শর্টসার্কিট’ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। আর্থিং: কার্যকর Earthing বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারেন্টকে নিরাপদ পথে মাটিতে পাঠায় এবং সুরক্ষা যন্ত্রকে দ্রুত ট্রিপ করতে সহায়তা করে। শুধু আর্থিং রড বসালেই দায়িত্ব শেষ হয় না; Earth Resistance এবং Continuity নিয়মিত পরীক্ষা ও নথিভুক্ত করতে হবে। LPS: Lightning Protection System বা বজ্রনিরোধব্যবস্থায় এয়ার টার্মিনাল, ডাউন কন্ডাক্টর, আর্থ-টার্মিনেশন ও ইকুইপোটেনশিয়াল বন্ডিং সমন্বিতভাবে থাকতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে একটি বজ্রনিরোধক দণ্ড বসানো পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা নয়। কেবল ও ইনসুলেশন: অনুমোদিত লোড অনুযায়ী সঠিক আকারের মানসম্মত কেবল ব্যবহার করতে হবে। নির্দিষ্ট সময় পর Insulation Resistance Test, টার্মিনাল টাইটনেস পরীক্ষা এবং থার্মাল ইমেজিংয়ের মাধ্যমে অস্বাভাবিক উত্তপ্ত সংযোগ চিহ্নিত করা প্রয়োজন। জরুরি সার্কিটে ঝুঁকি অনুযায়ী অগ্নিসহনশীল ও কম ধোঁয়া উৎপাদনকারী কেবল ব্যবহার করা উচিত। SPD: বজ্রপাত বা বৈদ্যুতিক সুইচিং থেকে সৃষ্ট ক্ষণস্থায়ী অতিরিক্ত ভোল্টেজ সার্ভার, ফায়ার অ্যালার্ম, সিসিটিভি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নষ্ট করতে পারে। Surge Protective Device বা SPD এসব সংবেদনশীল সরঞ্জামকে সুরক্ষা দেয়। LPS ও SPD পরস্পরের বিকল্প নয়; সমন্বিত নকশায় উভয়ই প্রয়োজন। AFCI/AFDD: সাধারণ MCB অতিরিক্ত কারেন্ট বা শর্টসার্কিটে ট্রিপ করলেও ক্ষতিগ্রস্ত তার, ঢিলা সংযোগ বা ভাঙা ইনসুলেশন থেকে সৃষ্ট সব বিপজ্জনক বৈদ্যুতিক আর্ক শনাক্ত করতে পারে না। Arc-Fault Circuit Interrupter বা Arc-Fault Detection Device আগুন সৃষ্টির আগেই এমন আর্ক শনাক্ত করে সার্কিট বিচ্ছিন্ন করতে পারে। এর সঙ্গে RCCB/RCBO, সঠিক সার্কিট ব্রেকার সমন্বয়, হালনাগাদ Single Line Diagram, লোড ব্যালান্সিং এবং অনুমোদিত প্রকৌশলীর মাধ্যমে পর্যায়ক্রমিক বৈদ্যুতিক অডিট নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জাতীয় কর্তৃপক্ষের এখনই যা করা প্রয়োজন প্রথমত, আলোচিত চারটি অগ্নিকাণ্ডের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্বাধীন তদন্ত পরিচালনা করতে হবে। তদন্ত প্রতিবেদনে শুধু আগুনের উৎস নয়—Detection, Alarm, Containment, Suppression, Evacuation এবং Human Response-এর কোন স্তর কেন ব্যর্থ হয়েছে, তা উল্লেখ করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান জনস্বার্থে প্রকাশও করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, হাসপাতাল, শপিংমল, ফুডকোর্ট, শিল্পকারখানা, ডেটা সেন্টার ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্থাপনার জন্য ঝুঁকিভিত্তিক ফায়ার সেফটি অডিট চালু করতে হবে। কাগজপত্র দেখে ছাড়পত্র দেওয়ার পরিবর্তে সরঞ্জামের বাস্তব কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে প্রতি শিফটে প্রশিক্ষিত Emergency Response Team, ফায়ার ওয়ার্ডেন এবং স্পষ্ট Incident Command কাঠামো থাকতে হবে। বছরে অন্তত দুইবার পরিস্থিতিভিত্তিক মহড়া এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আকস্মিক No-Notice Drill আয়োজন করা উচিত। চতুর্থত, ফায়ার অ্যালার্ম, পাম্প, স্প্রিংকলার, হাইড্র্যান্ট, ফায়ার ডোর, জরুরি আলো ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের Inspection, Testing and Maintenance-এর ডিজিটাল রেকর্ড রাখতে হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবস্থা বন্ধ রাখা বা পরীক্ষার ভুয়া তথ্য দেওয়াকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পঞ্চমত, বড় অগ্নিকাণ্ডের পর একটি জাতীয় Lessons Learned Bulletin প্রকাশ করা উচিত, যাতে অন্য প্রতিষ্ঠান একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে। তদন্ত প্রতিবেদন ফাইলে বন্দী থাকলে মৃত মানুষ, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র—কেউ সেই তদন্ত থেকে উপকৃত হয় না। এই চারটি আগুন অনেক কথা বলছে। এগুলো বলছে—কোথাও প্রযুক্তি আছে, কিন্তু পরীক্ষা নেই; সরঞ্জাম আছে, কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ নেই; প্রশিক্ষণের সনদ আছে, কিন্তু বাস্তব দক্ষতা নেই; পরিকল্পনা আছে, কিন্তু নেতৃত্ব ও মহড়া নেই। ফায়ার সার্ভিস জাতীয় জরুরি প্রতিক্রিয়ার শেষ শক্তিশালী স্তম্ভ। কিন্তু আগুন লাগার পর প্রথম তিন থেকে পাঁচ মিনিট সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব দায়িত্ব। সেই মূল্যবান সময় হারিয়ে গেলে দূরের বা কাছের ফায়ার স্টেশন—কোনোটিই তা ফিরিয়ে দিতে পারে না। রাষ্ট্রের কাছে আবেদন—প্রতিটি বড় আগুনের পর শোক, পরিদর্শন ও তদন্ত কমিটির পরিচিত চক্র থেকে বেরিয়ে আসুন। অগ্নিনিরাপত্তাকে ভবনের ছাড়পত্র নয়, জাতীয় জননিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করুন। অগ্নিনিরাপত্তা কোনো দেয়ালে ঝোলানো সনদ, লাল রঙের সিলিন্ডার কিংবা ব্যয়বহুল যন্ত্রের নাম নয়। এটি নিরাপদ প্রকৌশল, কার্যকর প্রযুক্তি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষিত মানুষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ নেতৃত্ব এবং কঠোর জবাবদিহির একটি জীবন্ত সংস্কৃতি। আগুনের চারটি সতর্কবার্তা আমরা পেয়েছি—এখন প্রশ্ন, রাষ্ট্র কি পঞ্চমটির জন্য অপেক্ষা করবে? লেখক : ফায়ার, ডিজাস্টার অ্যান্ড ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞ; সাবেক পরিচালক, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। এইচআর/জেআইএম
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>