বিজ্ঞাপন
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে অর্থের অভাবে ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত হিয়া মনির চিকিৎসা থমকে আছে। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতার কারণে স্কুলে যেতে পারছে না শিশুটি। সুস্থ হয়ে আবারো সহপাঠীদের সঙ্গে স্কুলে ফিরতে চায় ৯ বছরের ছোট্ট হিয়া।
হিয়া মনির বাবা হরি মহন্ত পেশায় একজন চা বিক্রেতা। তার বাড়ি সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে। সামান্য আয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি একমাত্র মেয়ের চিকিৎসার ব্যয় বহন করা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে পারছেন না তিনি।
শিশুটির চিকিৎসা চালিয়ে তাকে সুস্থ করে তুলতে সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় মানুষের কাছে আর্থিক সহযোগিতার আবেদন জানিয়েছেন তার পরিবার, স্বজন, প্রতিবেশী ও শিক্ষকসহ সবাই।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বাড়ি যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। অন্যের বাসার দুই দেওয়ালের মাঝ দিয়ে জড়সড় হয়ে কোনো মতে গিয়ে দেখা মেলে তার বসতবাড়ির। এটি কোনো বসতবাড়ি নয়, যেন একটি ঝুপড়ি ঘর। সোয়া তিন শতাংশ জমির একপাশে পুরাতন কাপড় আর পলিথিনে মোড়ানো একটি টয়লেট। অন্যপাশে একটি নলকূপ। বাকি জায়গায় টিনের বেড়া আর চালের একটি ঘর। সংস্কারের অভাবে খুলে যাচ্ছে ঘরটির বেড়া। ঝুরঝুরে ঘরটির চালের বিভিন্ন অংশ খসে পড়ছে মাটিতে। ছিদ্র দিয়ে দেখা যাচ্ছে আকাশ। বৃষ্টি হলে গুছিয়ে নিতে হয় বিছানা। সেই বিছানায় শুয়ে আছে হিয়া মনি। কপালে হাত দিয়ে মেয়ের পাশে বসে আছেন মা বিউটি রানী।
তার আগে হরি মহন্তের সঙ্গে দেখা মেলে তার চায়ের দোকানে। উপজেলা পরিষদ পুকুরের পশ্চিম পাড়ে সরকারি জায়গায় পলিথিনে মোড়ানো নামেমাত্র একটি ঘর। চুলায় চায়ে কেটলি। সামনে গোটা ছয়েক চায়ের কাপ ও গ্লাস। টেবিল একটা, আর জোড়াতালি দিয়ে দুইটি বেঞ্চ। কাস্টমার গোটা পাঁচেক। আর খাদ্যপণ্য বলতে কয়েকটি বিস্কিট ও ছোট কেক। সব মিলিয়ে বড়জোর দেড়-দুই হাজার টাকা। দিন শেষে যা আয় হয় তা দিয়ে সংসারই চলে না হরি মহন্তের।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, আর কোনো সন্তান নেই এ দম্পতির। উপজেলার শহীদ মিনার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াশোনা করছিল শিশুটি। প্রায় দু’বছর ধরে অসুস্থ হিয়া মনি। কয়েকজন ডাক্তারকেও দেখানো হয়েছিল। কিন্তু কিছুতেই জ্বর ও বমি কমেনি। সে কারণে মাস ছয়েক আগে শরণাপন্ন হন রংপুরে শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে। পরে সেখান থেকে পাঠানো হয় নিউরো বিশেষজ্ঞের কাছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে শিশু হিয়াকে ভর্তি করানো হয় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষার পর ধরা পড়ে ব্রেইন টিউমার। রেফার করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু মেয়েকে বাঁচানোর সাধ থাকলেও সামর্থ্য না থাকায় বিছানায় শুয়ে দিন কাটছে শিশুটির।
ক্ষীণ কণ্ঠে শিশু হিয়া মনি জানায়, ‘আমার মাথার যন্ত্রণা। মাথা কামড়াকামড়ি করে। হাঁটতে পারি না। চোখে ঝাপসা দেখি। খাইতে পারি না। আমি আবার স্কুলে যেতে চাই। আমি বাঁচতে চাই।’
মা বিউটি রানী বলেন, ‘রংপুরের ডাক্তার বলেছেন মেয়ের মাথায় টিউমার হয়েছে। ঢাকায় গিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে। এত টাকা কই পাবো আমরা। সে কারণে মেয়েকে বাঁচাতে সবার সহযোগিতা চাই।’
হরি মহন্ত বলেন, প্রায় দুইবছর ধরে অসুস্থ মেয়ে। এখানকার ডাক্তারদের দেখিয়েছিলাম। কিন্তু সুস্থ হয়নি। পরে মাস ছয়েক হবে রংপুরের বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম। তাদের পরামর্শে পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করাই। শেষে তারা বলেছে ব্রেন টিউমার হয়েছে। এখন ঢাকায় চিকিৎসা করাতে হবে। এতে টাকা লাগবে কমপক্ষে ৫ লাখ। এত টাকা কই পাবো। চিকিৎসা বিনে বাড়িতে পড়ে আছে মেয়ে। দিন দিন মেয়ে মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে। চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর করার কিছুই নেই আমার। কথাটা বলেই কেঁদে ফেলেন হরি মহন্ত।
প্রতিবেশী মো. সাব্বির হোসেন নিয়ন বলেন, ‘বাচ্চা মেয়েটি ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত। রংপুরে চিকিৎসা করানোর সময় আমরা সাধ্য অনুযায়ী তাকে সহযোগিতা করেছি। কিন্তু এখন তার চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। হরির যে ছোট্ট চায়ের দোকান, তা দিয়ে তার সংসারের খরচই ঠিকমতো চলে না। তাই মেয়েটির চিকিৎসায় সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান সবাইকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার অনুরোধ করছি।’
এ বিষয়ে কথা হয় প্রধান শিক্ষক কমলা কান্ত বসুনিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, হিয়া মনি এ স্কুলে পড়াশোনা করতো। সে অত্যন্ত শান্ত, ভদ্র ও মিষ্টি স্বভাবের একটি মেয়ে। অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ে আসছে না।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এর আগে আমরা শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা মিলে কিছু টাকা পয়সা দিয়েছিলাম। শুনেছি এবারে নাকি ঢাকায় চিকিৎসা করাতে হবে। প্রিয় শিক্ষার্থীকে বাঁচাতে তিনিও সবার আর্থিক সহায়তা চেয়েছেন।
এ বিষয়ে কথা হয় উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রাজীব কুমার বাগচীর সঙ্গে। তিনি বলেন, এখনো বরাদ্দ আসেনি। আবেদন দিতে বলেন। এলেই ব্যবস্থা নিবেন বলে আশ্বাস দেন তিনি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। আবেদন দিতে বলেন। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আনোয়ার আল শামীম/এফএ
বিজ্ঞাপন