বিজ্ঞাপন
আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালে একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল। তখন দুইশোর বেশি মামলার বিচারকাজ শেষ করা হয় ট্রাইব্যুনালে।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এখন সেই একই ট্রাইব্যুনালে জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা মামলাগুলোর বিচার চলছে। এরই মধ্যে ছয়টি মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে। যেখানে ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ডসহ ৬১ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে এখন পর্যন্ত মোট ৭২টি মামলায় আসামির সংখ্যা ৫০৩ জন। তাদের মধ্যে পলাতক ৩১৫ জন। ছয়টি মামলার রায় ঘোষণা হলেও বাকি ৬৬টি মামলার এখনো বিচার চলছে। যার মধ্যে রায়ের অপেক্ষায় দুটি, বিচারাধীন ২৩টি ও তদন্ত চলছে ৪১টি মামলার।
রায়ের জন্য অপেক্ষমান দুটি মামলার মধ্যে একটি কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা মামলা। এ মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফসহ চারজনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমান রয়েছে ট্রাইব্যুনালে। অন্য মামলায় দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে চলছে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন। এ মামলাটিও রায়ের অপেক্ষমান পর্যায়ে রয়েছে।
পুনর্গঠন হলো প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিচারের জন্য ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ পুনর্গঠন করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। তারও আগে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে চিফ প্রসিকিউটর করে ওই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর প্রসিকিউশন টিম পুনর্গঠন করা হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকে আরও গতিশীল করতে ২০২৫ সালের ৮ মে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গঠন করা হয়। বর্তমানে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনে ২৩ জন প্রসিকিউটর ও তদন্ত সংস্থায় ২৬ জন কর্মকর্তা রয়েছেন।
দুটি ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুম, খুন, নির্যাতন এবং মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম চলছে। যার মধ্যে এখন পর্যন্ত জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে হওয়া ছয়টি মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়েছে।
রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ এসেছে। তাদের মধ্যে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ পলাতক রয়েছেন ১১ জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য চার আসামি কারাগারে রয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান। যাকে দুটি মামলায় (চাঁনখারপুল ও রামপুরা) মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
৬ মামলায় ৬১ জনের সাজা, ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয়টি মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়েছে। রায়ে ৬১ জন বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এর বাইরে যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে ৪৬ জনকে।
জুলাই-আগস্টে সংঘটিত হত্যা-নির্যাতন এবং আওয়ামী লীগ শাসনামলে গুম-খুন ও নির্যাতনের ঘটনায় সব মিলিয়ে মামলার সংখ্যা ৭২টি। তবে গুম-খুনের কোনো মামলার রায় এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
আরও পড়ুন
মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড
তবে এখন আরও দুটি মামলা রায় ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে। এরমধ্যে একটি মামলায় মাহবুবউল আলম হানিফসহ চারজন এবং অন্য একটি মামলায় ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের ৭২টি মামলার মধ্যে বর্তমানে ২৩টি মামলা বিচারাধীন। ৪১টি মামলা তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে। যার মধ্যে কোনোটির তদন্ত শেষ আবার কোনোটি রয়েছে মাঝামাঝি পর্যায়ে।
৭২ মামলায় আসামি ৫০৩, পলাতক ৩১৫, গ্রেফতার ১৮৫
ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, ৭২টি মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৫০৩ জন। এর মধ্যে পলাতক ৩১৫ জন। গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন ১৮৫ জন। তাদের মধ্যে একজন আত্মহত্যা করেছেন। গ্রেফতার হয়ে করাগারে সাজা ভোগ করছেন এক আসামি।
একই মামলায় একাধিকবার আসামি
৫০৩ আসামির মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। কারও বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ থাকলে তাকে একাধিকবারই আসামি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সাতটি পৃথক পৃথক অভিযোগে মামলা রয়েছে। সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে পৃথক অভিযোগে মামলা রয়েছে, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে, সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে এমনিভাবে আরও অনেকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগে মামলা রয়েছে।
তবে, আন্তর্জাতিক অপরাধে ট্রাইব্যুনালে এখন পর্যন্ত যে ছয়টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে সেখানে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান একাই দুটি মামলার আসামি। এছাড়া আর কোনো আসামিকে এখনো পর্যন্ত একাধিকবার গণনা করা হয়নি।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ৭২টি মামলায় ৫০৩ আসামির মধ্যে পলাতক ৩১৫ জন। ছয়টি মামলার রায় ঘোষণা হলেও রায়ের অপেক্ষায় দুটি, বিচারাধীন ২৩টি ও তদন্ত চলছে ৪১টি মামলার। বিচারাধীন ২৩ মামলার মধ্যে জুলাইয়ের ১৪টি এবং গুম-খুনের ৯টি।
সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে জয়-পলকের বিরুদ্ধে
ট্রাইব্যুনাল দুটিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা ১৪ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। এর মধ্যে শেখ হাসিনার তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা ও তার সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ পর্যায়ে।
সালমান ও আনিসুলের বিরুদ্ধে
আওয়ামী লীগ সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ-বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।
জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে
শতাধিক ব্যাক্তিকে গুম করার কারণে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় একমাত্র আসামি সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেলের (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।
রয়েছেন আরও অনেকে
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক এমপি শামীম ওসমান, সাবেক এমপি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী, যুবলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। গুমের অভিযোগে শেখ হাসিনাসহ সেনা কর্মকর্তাদের দুটি মামলায় তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।
তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল
২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ হামলা অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ৪১ জনকে আসামি করা হয়েছে। গত ২৭ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে এ সংক্রান্ত মামলায় অভিযোগ দাখিল করা হয়। এ মামলায় আসামিদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার মন্ত্রিপরিষদের সাবেক সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্যসহ ১৫ জন রয়েছেন। এছাড়া সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদসহ বিভিন্ন বাহিনীর ২১ জন সাবেক সদস্য, তিনজন রাজনীতিবিদ ও সংগঠক এবং দুজন সাংবাদিক রয়েছেন আসামির তালিকায়।
আরও পড়ুন
শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা: আইনমন্ত্রী
এছাড়াও তদন্ত সংস্থা থেকে প্রতিবেদন ও প্রসিকিউশন থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এইচ এম শামসুদ্দীন চৌধুরী মানিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি মাকসুদ কামাল ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।
রায় ও বিচারে সন্তুষ্ট রাষ্ট্রপক্ষ
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর এখন পর্যন্ত ছয়টি মামলার বিচার শেষে রায় ঘোষণা এবং বিচারাধীন মামলার বিষয়ে সন্তুষ্ট কি না জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মাত্র দেড় বছরে ছয়টি সেনসেটিভ মামলার রায় ঘোষণা করেছে। এত অল্প সময়ে মামলায় রায় ঘোষণার নজির অন্য কোনো আদালতের নেই। সেখানে রায়ের সন্তুষ্টির বিষয়টি আপনারা মূল্যায়ন করবেন।
‘জুলাই শহীদদের পরিবার ও ভিকটিমদের আশা আছে, তারাও বিচারপ্রত্যাশী। তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী বিচারকাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। আমাদের লোকবল সংকটসহ বিভিন্ন সংকট রয়েছে। তারপরও সবাই কাজ করে যাচ্ছেন।’
তিনি বলেন, এত কম সময়ে একাধিক আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের পর সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায় ঘোষণা হতে অতীতে দেখা যায়নি। ট্রাইব্যুনালের এসব রায় এবং চলমান বিচারে আমরা অবশ্যই সন্তুষ্ট।
‘আমরা সবাই একটি জায়গায় একমত, কাউকে যেন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সাজা দেওয়া না হয়। কোনো অপরাধী যেন ছাড়া পেয়ে না যায়। কোনো নিরপরাধী যেন হয়রানির শিকার না হন’—যোগ করেন তিনি।
বিচারাধীন ২৩ মামলা
দুই ট্রাইব্যুনালে পৃথক ২৩ মামলায় ৩১৫ আসামির বিরুদ্ধে বিচার চলছে। এরমধ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিক মামলার প্রধান আসামি। অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদসহ ৩১ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তা। এছাড়া রয়েছেন রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, পুলিশের সাবেক সদস্য ও অন্যান্য বাহিনীর সাবেক সদস্য।
রায়ের অপেক্ষায় দুই মামলা
গণঅভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ার ছয়জনকে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ট্রাইব্যুনাল গত ১০ জুন আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবউল আলম হানিফসহ চারজনের রায় অপেক্ষমান রেখেছেন। অন্য মামলায় ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে রায় অপেক্ষমান রাখা হয়েছে।
শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে প্রথম রায়
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে করা মামলার রায় দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। দুটি অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ রায় দেন। রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির অপরাধ প্রমাণিত। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে চানখাঁরপুলে ছয় হত্যাকাণ্ড এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
একটি অভিযোগে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অ্যাপ্রুভার (রাজসাক্ষী) হওয়ায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
চাঁনখারপুলের ছয় হত্যা দ্বিতীয় মামলায় রায়
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর চাঁনখারপুলে ছয়জনকে হত্যা মামলায় সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। গত ২৬ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় দেন। দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য দুজন হলেন সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ্ আলম মো. আখতারুল ইসলাম। মামলার অন্য পাঁচ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।
আশুলিয়া লাশ পোড়ানো মামলায় তৃতীয় রায়
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সাতজনকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। দুজনকে সাত বছর করে কারাদণ্ড। আর একজনকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২ গত ৫ ফেব্রুয়ারি এ রায় দেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
আরও পড়ুন
হাসিনাকে এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি ফাঁসির মঞ্চে নেওয়া হবে: নাহিদ ইসলাম
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় আসামি হলেন সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, আশুলিয়া থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ এফ এম সায়েদ, আশুলিয়া থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল মালেক, সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) বিশ্বজিৎ সাহা, সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদার ও যুবলীগ ক্যাডার রনি ভূঁইয়া।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামি হলেন- ঢাকা রেঞ্জের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) সৈয়দ নুরুল ইসলাম, ঢাকা জেলার সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আসাদুজ্জামান রিপন, ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফী, সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শহিদুল ইসলাম, সাবেক পরিদর্শক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান, সাবেক পরিদর্শক নির্মল কুমার দাস ও ঢাকা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি উত্তর) সাবেক পরিদর্শক মো. আরাফাত হোসেন।
আশুলিয়া থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) আরাফাত উদ্দীন ও কামরুল হাসানকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, আশুলিয়া থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) শেখ আবজালুল হককে ক্ষমা করা হয়েছে। তিনি এই মামলায় অ্যাপ্রুভার (রাজসাক্ষী) হয়েছিলেন।
চতুর্থ রায় আবু সাঈদ হত্যায়
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই মামলার ৩০ আসামির মধ্যে তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্য ২৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুজন আসামি হলেন, পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন এবং সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। তারা দুজনেই গ্রেফতার আছেন।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গত ৯ এপ্রিল এ রায় ঘোষণা করেন। এই ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
রামপুরায় কার্নিশে ঝুলানো গুলি পঞ্চম রায়
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি এবং আরও দুজনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একজনকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। অন্য আসামিকে ২০ বছরের কারাদণ্ড।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গত ২৮ জুন এ রায় দেন। এই ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম ও বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান (ইতিমধ্যে চানখাঁরপুলের মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে), ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান। এই তিন আসামিই পলাতক।
রামপুরা থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিনিও পলাতক। এছাড়া রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিনি গ্রেফতার আছেন।
সর্বশেষ ও ষষ্ঠ রায় হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় করা মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২ গত ৩০ জুন এ রায় দেন। এ ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। মামলার একমাত্র আসামি ইনুর বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়েছিল।
এফএইচ/এমকেআর
বিজ্ঞাপন