বিজ্ঞাপন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই নতুন কোনো ট্রেন্ড চোখে পড়ে। কখনো এআই দিয়ে নিজের ৮০-র দশকের ছবি বানানো, কখনো নির্দিষ্ট কোনো গানের সঙ্গে রিল বানানো, আবার কখনো নতুন কোনো ফ্যাশন, মিম কিংবা চ্যালেঞ্জে অংশ নেওয়া। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দেখা যায় পরিচিতদের প্রায় সবাই সেই ট্রেন্ডে মেতেছেন। তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে আমি এতে অংশ নিলাম না, তাহলে কি আমি সবার থেকে পিছিয়ে পড়ছি?
আসলে ট্রেন্ডে অংশ নেওয়া আর সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা এক বিষয় নয়।
সবাই করছে, তাই আমাকেও করতে হবে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো-এখানে অন্যরা কী করছে, তা খুব সহজেই আমাদের চোখে পড়ে। ফলে নিজের জীবনকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতাও তৈরি হয়। নতুন গবেষণায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার, ‘কনফর্মিটি’ বা অন্যদের সঙ্গে নিজেকে মেলানোর প্রবণতা এবং অন্যের অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তার মধ্যে সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে।
ধরুন, আপনার বন্ধুরা সবাই কোনো নতুন এআই ফিল্টার ব্যবহার করে ছবি পোস্ট করলেন। আপনিও হয়তো ছবিটি বানাতে আগ্রহী নন। কিন্তু একের পর এক পোস্ট দেখে মনে হলো, ‘আমি না করলে সবাই ভাববে আমি কিছুই বুঝি না।’
এখানেই সমস্যা। নিজের ইচ্ছার বদলে অন্যের প্রতিক্রিয়াকে সিদ্ধান্তের মাপকাঠি বানিয়ে ফেললে ট্রেন্ড আর বিনোদন থাকে না, সেটি চাপ হয়ে দাঁড়ায়।
আরও পড়ুন
এক মানুষের একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট কেন, মনোবিজ্ঞান কী বলে?
ট্রেন্ড মানেই কিন্তু খারাপ নয়
তবে এর মানে এই নয় যে সব ট্রেন্ড এড়িয়ে চলতে হবে। নতুন কোনো ট্রেন্ড আপনাকে আনন্দ দিচ্ছে, নতুন কিছু শেখাচ্ছে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করছে তাহলে তাতে অংশ নেওয়ার সমস্যা কোথায়? বরং নতুন কিছু চেষ্টা করার মধ্যেও আনন্দ আছে। কোনো জনপ্রিয় এআই টুল ব্যবহার করে ছবি বানানো, নতুন অ্যাপের ফিচার পরীক্ষা করা কিংবা কোনো মজার ট্রেন্ডে বন্ধুদের সঙ্গে অংশ নেওয়া এসবই স্বাভাবিক ডিজিটাল অভিজ্ঞতা। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন মনে হয় ‘ট্রেন্ডে নেই মানেই আমি পিছিয়ে।’
এই FOMO-ই কি আসল কারণ?
মনোবিজ্ঞানে এর সঙ্গে ‘ফেয়ার অব মিসিং আউট’ বা এফওএমও-র সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ অন্যরা এমন কোনো আনন্দদায়ক বা গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতার অংশ হচ্ছে, যেটি থেকে আপনি বাদ পড়ে যাচ্ছেন এমন এক ধরনের ভয় বা অনুশোচনা।
ঢাকার কিছু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নিয়ে ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় ৫০০ জনের মধ্যে মোট ৬৫.৬ শতাংশ (৫৬.৮ শতাংশ মাঝারি ও ৮.৮ শতাংশ উচ্চ) শিক্ষার্থীই কোনো না কোনোভাবে ‘এফওএমও’ বা ‘পিছিয়ে পড়ার ভয়’-এ ভুগছেন। যার মধ্যে ৫৬.৮ শতাংশের মাঝারি মাত্রার এফওএমও এবং ৮.৮ শতাংশের উচ্চ মাত্রার এফওএমও পাওয়া গেছে। গবেষণায় এফওএমও-র সঙ্গে স্মার্টফোন ব্যবহারের সমস্যা, রাত জেগে ফোন ব্যবহার ও ঘুমের সমস্যার সম্পর্কও দেখা গেছে। অর্থাৎ শুধু ‘সবাই করছে’ এই অনুভূতিটিও আমাদের অনলাইনে আরও বেশি সময় ধরে রাখতে পারে।
ট্রেন্ড না মানলে আপনি কি সত্যিই ব্যাকডেটেড?
একেবারেই নয়। কেউ নতুন ফ্যাশন অনুসরণ করেন, কেউ পুরোনো পোশাকেই স্বচ্ছন্দ। কেউ প্রতিদিন রিল বানান, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সপ্তাহে একবার ঢোকেন। কেউ নতুন এআই টুলের প্রতিটি ফিচার পরীক্ষা করেন, আবার কেউ প্রয়োজন না হলে সেগুলো ব্যবহারই করেন না। সময়ের সঙ্গে এগিয়ে থাকা মানে প্রতিটি নতুন ট্রেন্ড জানা নয়। বরং কোনটা আপনার জন্য দরকার আর কোনটা শুধু মুহূর্তের উত্তেজনা সেটা বুঝতে পারাই আসল আধুনিকতা।
আরও পড়ুন
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগেও চিঠির খামে লুকিয়ে আছে ভালোবাসা
‘না’ বলার স্বাধীনতাটাও দরকার
সব ট্রেন্ডে অংশ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। কোনো ট্রেন্ড আপনার ব্যক্তিগত মূল্যবোধের সঙ্গে না মিললে, গোপনীয়তার ঝুঁকি থাকলে কিংবা শুধু সামাজিক চাপের কারণে করতে ইচ্ছা হলে না বলাই ভালো। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ট্রেন্ড হয়তো কয়েক দিন পরেই হারিয়ে যাবে। কিন্তু সেটি করতে গিয়ে আপনার সময়, টাকা, ব্যক্তিগত তথ্য কিংবা মানসিক স্বস্তির যে ক্ষতি হতে পারে, তার প্রভাব থেকে যেতে পারে।
সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোও দেখাচ্ছে, ‘এফওএমও’ ও সামাজিক তুলনা অনলাইন ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মানসিক চাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্লান্তির মতো সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই পরেরবার ফেসবুক, টিকটক বা ইনস্টাগ্রামে দেখবেন সবাই একই কাজ করছে, তখন নিজেকে একটি প্রশ্ন করুন ‘আমি সত্যিই এটা করতে চাই, নাকি শুধু সবাই করছে বলে করছি?’
উত্তর যদি হয় দ্বিতীয়টি, তাহলে ট্রেন্ডটা ছেড়ে দিলেও আপনার কিছু হারানোর নেই। বরং নিজের পছন্দ অনুযায়ী চলতে পারাটাই হয়তো প্রমাণ করে আপনি ট্রেন্ডের পেছনে ছুটছেন না, নিজের সময়ের নিয়ন্ত্রণটা নিজের হাতেই রেখেছেন।
কেএসকে
বিজ্ঞাপন