বিজ্ঞাপন
‘আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরে আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে’ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (বার) সভাপতি ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকনের এমন মন্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতি এজলাস ত্যাগ করেছেন। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এজলাসে এ ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
ঘটনার সূত্রপাত মঙ্গলবার সকালে একাধিক রিট মামলা এবং তথ্য গোপনের অভিযোগে একজন রিটকারী ও তার আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা করে কস্ট আরোপের আদেশকে কেন্দ্র করে। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বেঞ্চ ওই অর্থ ৩০ দিনের মধ্যে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
যাদের কস্ট আরোপ করা হয়েছে, তারা হলেন রিটকারী মো. নুর আলম ও আইনজীবী সুফিয়া আহমেদ। অন্যদিকে, লিভ টু আপিলকারী মিজানুর রহমান মুরাদের পক্ষে আদালতে ছিলেন আইনজীবী ব্যারিস্টার অনীক আর হক, মোহাম্মদ শিশির মনির ও আইনজীবী অমিত দাশগুপ্ত।
বার সভাপতি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে কথাটি বলেছেন, তা স্পষ্ট নয়। প্রধান বিচারপতি আইনজীবীদের মামলার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেননি কিংবা কোনো আদালতকে জামিন দেওয়া বা না দেওয়ার নির্দেশনাও দেননি
মামলার পটভূমিতে জানা যায়, ২০১৮ সালে মো. মিজানুর রহমান মুরাদকে কাজী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে এনামুল হক তার নিয়োগ চ্যালেঞ্জ করে রিট করেন। ২০২২ সালে হাইকোর্ট মুরাদের নিয়োগ বাতিল করে রায় দেন। এর বিরুদ্ধে মুরাদ লিভ টু আপিল করেন। আপিল বিভাগ সেই আবেদন মঞ্জুর করে হাইকোর্টের রায় স্থগিত করেন। ফলে মুরাদ কাজী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
আরও পড়ুন
মাহবুব উদ্দিন খোকনের সঙ্গে কথা কাটাকাটি, এজলাস ছাড়লেন প্রধান বিচারপতি
আদালতে আইনজীবী সুফিয়ার কস্ট কমানোর অনুরোধ করেন ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন। জবাবে প্রধান বিচারপতি বলেন, আদালত সবকিছু বিবেচনা করেই আদেশ দিয়েছেন এবং তা পরিবর্তন করা হবে না। তার ভাষায়, কারণ এখানে সিরিয়াস প্রতারণা করা হয়েছে।
আইনজীবী সমিতির সভাপতি কোনো আইনজীবীর সাজা বা কস্ট কমানোর অনুরোধ করতে পারেন। তবে আদালত যে কস্ট দিয়েছে, তা অযৌক্তিক নয়। কারাদণ্ড দেয়নি, এটাই তো অনেক। কারণ, আইনজীবী পেশাগত অসদাচরণ করেছেন।
একপর্যায়ে ব্যারিস্টার খোকন প্রধান বিচারপতিকে বলেন, ‘আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরে আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে।’
প্রধান বিচারপতি বিস্ময়ের সঙ্গে জানতে চান, ‘আমি চিফ জাস্টিস হওয়ার পর কি লইয়ারদের ইনকাম কমে গেছে?’
খোকন তখন বলেন, আপিল বিভাগে আগে ১১ জন বিচারপতি ছিলেন এবং তিনটি বেঞ্চ ছিল। এখন একটি বেঞ্চ রয়েছে। একটি মামলায় স্টে (স্থগিতাদেশ) হলে সেটির শুনানিতে অনেক সময় লেগে যায়। ইনকাম ওই অর্থে কমে গেছে।
এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনি যে কথাটা বলেছেন, সেটা সম্পূর্ণভাবে আদালত অবমাননার শামিল। যেহেতু আপনি এত বড় একটা কথা বলেছেন, আমি আজ আর আদালতের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবো না।’
আরও পড়ুন
একই বিষয়ে একাধিক রিট, আইনজীবী-রিটকারীকে দিতে হবে ১০ লাখ টাকা
এরপর প্রধান বিচারপতিসহ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা এজলাস ত্যাগ করেন। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, এরপর আর আদালত বসেনি।
ঘটনার পর ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি প্রধান বিচারপতির কাছে বিনয়ের সঙ্গে বলেছি, তার দায়িত্ব নেওয়ার পর আপিল বিভাগে মামলা খুব একটা হচ্ছে না এবং আইনজীবীদের আয় কমে গেছে।’
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর কস্ট কমানোর অনুরোধ করতে গিয়ে বারের সভাপতি যদি কোনো ভুল করে থাকেন, সেটি অনুচিত। একই সঙ্গে প্রধান বিচারপতি বিচারকসুলভ মনোভাব নিয়ে বিষয়টি এজলাসে থেকেই সমাধান করলে ভালো হতো
একজন জুনিয়র আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা কস্ট দেওয়া অনেক বেশি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি কস্ট মওকুফের অনুরোধ করেছিলেন বলেও জানান।
খোকন বলেন, ওই আদালতে মেনশন সিস্টেম (মামলা দ্রুত শুনানির জন্য আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণের ব্যবস্থা) নেই। কোনো মামলা কজলিস্টের নিচে চলে গেলে তা মেনশন করা যায় না। আইনজীবীদের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি বিনয়ের সঙ্গে কথাগুলো বলেছেন এবং প্রধান বিচারপতি এতটা প্রতিক্রিয়া দেখাবেন, তা ভাবেননি।
এ সংক্রান্ত বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, মাহবুব উদ্দিন খোকন এই মামলার বাদীপক্ষে শুনানিতে অংশ নিয়েছেন। আইনজীবীদের কল্যাণে কিছু কথা প্রধান বিচারপতির কাছে বলেছেন বলে আদালতের বাইরে গণমাধ্যমের কাছে মাহবুব উদ্দিন খোকন যে দাবি করেছেন, আসলে এমন কোনো কথা এই মামলার প্রসিডিংয়ে হয়নি।
বিচারিক প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অস্বচ্ছতা তারা প্রত্যাশা করেন না উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, প্রধান বিচারপতি এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।
আরও পড়ুন
তারেকের বক্তব্য সরানোর নির্দেশ / বিএনপির আইনজীবীদের অনাস্থা, হট্টগোলের মধ্যে বিচারকদের এজলাস ত্যাগ
ঘটনাটি নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বাংলাদেশ আইন সমিতির সাবেক আহ্বায়ক ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনির হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, আইনজীবী সমিতির সভাপতি কোনো আইনজীবীর সাজা বা কস্ট কমানোর অনুরোধ করতে পারেন। তবে আদালত যে কস্ট দিয়েছে, তা অযৌক্তিক নয়। কারাদণ্ড দেয়নি, এটাই তো অনেক। কারণ, আইনজীবী পেশাগত অসদাচরণ করেছেন।
তবে মনির হোসেনের মতে, সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর কস্ট কমানোর অনুরোধ করতে গিয়ে বারের সভাপতি যদি কোনো ভুল করে থাকেন, সেটি অনুচিত। একই সঙ্গে প্রধান বিচারপতি বিচারকসুলভ মনোভাব নিয়ে বিষয়টি এজলাসে থেকেই সমাধান করলে ভালো হতো বলে মনে করেন তিনি।
তার ভাষায়, ‘প্রধান বিচারপতি এজলাসে বসেই বিষয়টির সমাধান দিলে ভালো হতো। তা না করে তিনি বেঞ্চ ছেড়ে উঠে গেছেন, এটি তার ঠিক হয়নি।’
আরও পড়ুন
বিচারপতি খায়রুল হকের শুনানিতে যা ঘটেছিল এজলাসকক্ষে
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের প্রচার সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান খান জাগো নিউজকে বলেন, আদালত ও আইনজীবীদের মধ্যে মতানৈক্য বা বিতর্ক নতুন কিছু নয়।
তার মতে, কখনো কখনো আইনজীবীদের আচরণে বিচারকেরা বিরক্ত বা ব্যথিত হয়ে এজলাস ত্যাগ করে থাকেন।
আইনজীবীদের আয় কমে যাওয়ার বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বার সভাপতি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে কথাটি বলেছেন, তা স্পষ্ট নয়। প্রধান বিচারপতি আইনজীবীদের মামলার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেননি কিংবা কোনো আদালতকে জামিন দেওয়া বা না দেওয়ার নির্দেশনাও দেননি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সংবিধান সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সিনিয়র আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব জাগো নিউজকে বলেন, আদালতকক্ষে এ ধরনের বিতর্ক হওয়া উচিত নয়, যদিও আবেগের বশে অনেক সময় অনেকে অনেক কথা বলে ফেলেন।
বিচারপতিদের শপথের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিচারপতিরা কিন্তু শপথ নেন যে, রাগ-অনুরাগের বশবর্তী না হয়ে বিচার করবেন। তার মতে, আপিল বিভাগের কার্যক্রম যে গতিতে চলছে, তা নিয়ে আইনজীবী মহলে অসন্তোষ রয়েছে।
আরও পড়ুন
আলোচনায় খালেদার জামিন ইস্যু ও এজলাসে হট্টগোল
তিনি বলেন, যে কোনো কারণেই হোক, আপিল বিভাগ স্থবির হয়ে পড়েছে। ‘আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আপিল বিভাগ বন্ধ হয়ে আছে।’ শুধু চেম্বার আদালত সক্রিয় থাকলে আপিল বিভাগকে পুরোপুরি সচল বলা যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধান বিচারপতি কেন এজলাস ছেড়ে চলে গেছেন, তা তিনিই ভালো বলতে পারবেন উল্লেখ করে মামুন মাহবুব বলেন, বারের সভাপতির বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক হতে পারত; কিন্তু বিষয়টিকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নেওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, আদালত হচ্ছে বিচারব্যবস্থার অভিভাবক। সভাপতির বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক করা যেত। সেখানে ব্যক্তিগত আবেগ বা অহমিকার কোনো জায়গা থাকা উচিত নয়।
এফএইচ/এসএইচএস
বিজ্ঞাপন