বিজ্ঞাপন
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল বলেছেন, রাজনীতি করে কী পেলেন বা কী পেলেন না, তা নিয়ে তার কোনো প্রত্যাশা নেই। মন্ত্রী বা এমপি হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও তার নেই। দল প্রয়োজন মনে করলে দায়িত্ব দেবে, না দিলে কোনো আক্ষেপ নেই—এমনটাই জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ৪৫১টি মামলা, গ্রেফতার, রিমান্ড ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেছেন সোহেল।
জাগো নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন বিএনপি নেতা হাবিব-উন-নবী খান সোহেল। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সালাহ উদ্দিন জসিম। দুই পর্বের ধারাবাহিকের আজ প্রকাশ হলো শেষ পর্ব।
বিএনপি নেতা হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সালাহ উদ্দিন জসিম, ছবি: জাগো নিউজ
জাগো নিউজ: আমরা অন্যদের ত্যাগের কথা শুনেছি। নেতা হিসেবে আপনিও বলেছেন। নেতারা অন্যদের কথা বলতে বেশি পছন্দ করেন। বাস্তবতা হলো আপনি যে ছোটবেলায় একটা কলেজ ছাত্রসংসদের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে এসেছেন। সেই জায়গা থেকে আওয়ামী লীগ আমলে সাড়ে চারশ মামলা নিয়ে কীভাবে জীবনযাপন করলেন?
হাবিব উন-নবী-খান সোহেল: আমি নিজের কথা বেশি বলতে পছন্দ করি না। এটা আসলে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। কারণ আমি যতক্ষণ যে দায়িত্ব পেয়েছি, আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করেছি। সত্যি কথা বলতে কী, অনেকে বিভিন্ন সাইডে কানেকশন রাখেন। সরকারি দলের সঙ্গে একটু একটু কানেকশন রাখেন যাতে মামলা-টামলা না হয়। আমরা তো ওই পলিটিক্স কখনোই করিনি। যার জন্য কোথাও কোনো মামলা হলে আমার নামটা থাকতোই। মানে আমার নাম ছিল না মামলায়, এমন ঘটনা কমই ঘটতো।
দেখতে দেখতে একদিন দেখলাম যে ৩৬০’র মতো মামলা। আচ্ছা, তাহলে গারফিল্ড সোবার্সের টেস্টের এক ইনিংসে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড কত? ৩৬৫। তাই না? যেদিন আমার ৩৬৫তম মামলা হয়, সেদিন মহানগর নাট্যমঞ্চে আমাদের একটি প্রোগ্রাম ছিল। সেদিন বললাম ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যান গারফিল্ড সোবার্সের রেকর্ড ভাঙলাম। খেলায় গারফিল্ড সোবার্সের রেকর্ড ভেঙেছেন ব্রায়ান লারা। উনি সর্বোচ্চ রান করেছেন ৪০০। আমারও ঠিক যেদিন ৪০০ মামলা হলো, ওইদিনও ওইখানেই (নাট্যমঞ্চে) একটি প্রোগ্রাম ছিল। সেদিন আমি বললাম যে, আমি আজ ব্রায়ান লারার রেকর্ডটা ভাঙলাম। এই করতে করতে আমার মামলার সংখ্যা ৪৫১টি হয়ে গেছে।
জিনিসগুলো যখন হয় তখন বোঝা যায় না, পরে যখন অ্যারেস্ট হই তখন বোঝা যায় যে, একটা মামলার কত জ্বালা-যন্ত্রণা। এই দেখা যাচ্ছে- জেলে আছি দিনের পর দিন, একটা মামলায় জামিন হয়, আবার আরেকটা মামলা দিয়ে দেয় কোর্টে। আবার সেটা ফেস করতে হয়।
আরও পড়ুন
বিএনপির শক্তি জনগণ, তাদের বিশ্বাস নিয়েই আমরা চলব
ক্ষমতার পালাবদল ও নেতৃত্বের পরিবর্তনে ৪৮ বছরে কী পেল-কী হারাল বিএনপি
ভাবি যে এবার বোধহয় ছাড়া পাবো, ছাড়া পাওয়ার পর জেলগেটে গিয়ে দেখি যে আরেকটা মামলা চলে আসছে। এভাবেই আমার স্ত্রী, কন্যারা এক প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেই ছিলেন গত ১৫টি বছর। আমার ওয়াইফ যদিও জব করে, কিন্তু মামলাগুলো তো তার কিছু খোঁজখবর রাখতে হয়েছে, অনেক কষ্ট করেছে।
আমার ছোট ভাইকে সারাক্ষণ ফাইল নিয়ে দৌড়াতে হয়েছে কোর্টে কোর্টে। আমার যারা উকিল, তাদের তো পয়সা-কড়ি দিতে পারতাম না, তারা পয়সা ছাড়াই আমার মামলা লড়েছে। এখন তাদের কাছে তো আমার ঋণের শেষ নাই। যাই হোক, এই যে পলিটিক্সে, এই যে প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে যে রাজনীতি করা, এটি পরে আমি অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম।
আমি ভেবেছিলাম যে রাস্তায় শেখ হাসিনা গেছেন, এতে তো আমরা হয়তো পালাতে পারবো না। বাই চান্স পালাতে না পারি, তাহলে হয়তো বা আমার যে মামলার সংখ্যা, আমার জেল দাঁড়ায় ৭০০ থেকে ৮০০ বছর। আমি চিন্তা করলাম যে যদি হাসিনারে সরাইতে না পারি, তাহলে তো আমাদের আর বের হওয়ার কোনো সুযোগ নাই। ধরেই নিয়েছিলাম যে আমাদের জীবনটা তো প্রায় এভাবেই চলে যাবে।
রাস্তায় রোড এক্সিডেন্টে জীবন চলে যেতে পারতো, ৯০ সালে গুলি খেলাম তখনও তো জীবন চলে যেতে পারতো। যাই হোক, বোনাস লাইফে আছি, ঠিক আছে। যদি বাকি জীবন জেলে থাকতে হয় থাকবো, বাট যে স্ট্যান্ডে আছি, এই স্ট্যান্ডে আপসহীন ছিলাম। অন্যায়ের সঙ্গে কখনোই কোনো আপস নেই এবং অপশক্তির সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই, কোনো রকম সমঝোতা নাই। একদম স্ট্রেট লাইনে ছিলাম, এই জীবনটা চলে গেলে যাবে, বাট কোনো আপস করবো না।
হামলা ও পুলিশি নির্যাতনের শিকার হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, ছবি: সোহেলের ফেসবুক থেকে
জাগো নিউজ: কখনো থানার গারদ, কোর্টের গারদ অথবা প্রিজন ভ্যান বা জেলখানা, অথবা রিমান্ড, কোথায় বেশি কষ্ট মনে হতো?
হাবিব উন-নবী-খান সোহেল: একবার আমরা একটা মিছিল করেছিলাম। একটা কর্মসূচি দিয়েছিলাম, নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু ছিল সহযোদ্ধা, আমরা একটা কর্মসূচি দিয়েছিলাম শেখ হাসিনাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি একটা ডিগ্রি দিচ্ছিলেন। আমরা বলছিলাম যে শেখ হাসিনা যে স্বৈরতন্ত্রের পক্ষে কাজ করছেন, অধিকার কেড়ে নিয়েছেন, তাকে ডিগ্রি দেওয়া যাবে না। এই ডিগ্রি দেওয়ার প্রতিবাদে আমরা একটি সমাবেশ দিয়েছিলাম, সেই সমাবেশে হামলা চালালো শেখ হাসিনার পুলিশ বাহিনী। সে কি প্রচণ্ডতম হামলা হলো আমাদের ওপর!
আমাদের বহু নেতাকর্মীকে রাস্তায় ফেলে পেটানো হলো, ধরে নিয়ে যাওয়া হলো। আমাদের পার্টি অফিসের পাশে একটা স্থাপনা যেখানে আজ ভিক্টোরি হোটেল, সে গর্তের মধ্যে অনেকে পড়ে গেল। অনেকের হাড় বা হাত-পা ভেঙে গেল। আমাদের তখন একদম সামনে থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো। ধরে নিয়ে আমাদের এই ছবিটাও এই রুমে আছে। আমার শার্ট-টার্ট ছিঁড়ে রাস্তা দিয়ে টানতে টানতে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো। থানার ভেতরে, থানার গারদের ভেতরে পর্যন্ত আমাদের লাঠিপেটা করলো। আমার সহযোদ্ধা নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুকে টানাহ্যাঁচড়া করে নেওয়া হলো থানার গারদে। সেখানেও যে নির্যাতন হয় সেটা আমরা দেখেছি, আমরা নিজেদের শরীরে তা ধারণ করেছি। এরপর বিভিন্ন রিমান্ডের সময় আমাদের ডিবি গারদে রাখা হতো। রাজবন্দি যারা পলিটিক্স করে তাদের সোশ্যাল ক্রিমিনাল যারা, যারা ড্রাগ লর্ড, ড্রাগ ব্যবসায়ী, চোর, ছিনতাইকারীর সঙ্গে রাখা হতো। তারাও মানুষ কিন্তু তাদের তো অপরাধের একটা মাত্রা আছে, একটা ধারা আছে। আমাদের তো বেশিরভাগই ফলস কেস। অথচ নিয়ে একসঙ্গে রাখা হয়। এক অমানবিক পরিবেশ। ছোট্ট একটা রুমের মধ্যে যেখানে ১০ জন থাকা যায় না, সেখানে ৫০, ৬০, ১০০ জন, ১৫০ জন রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন
যেসব ঘটনা বদলে দিয়েছে বিএনপির রাজনৈতিক গতিপথ
জনগণকে দেওয়া অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হয়নি বিএনপি, এটি আমাদের গর্বিত অতীত
একবার আমাদের বেশ কয়েকজন নেতা একসঙ্গে আমরা কোর্টে স্যারেন্ডার করলাম। সব সিনিয়র নেতা যারা আছেন বেশিরভাগই ছিলেন সে সময়, তারাসহ আমরা বহুজন। আমাদের সবাইকে একসঙ্গে রিমান্ডে নেওয়া হলো। সে ডিবি অফিসে গিয়ে তখন আমাদের থাকার জায়গা হচ্ছে না। তখন গারদ ভর্তি। তখন আমাদের দিল- ডিবির গারদের বাইরে কিছু জায়গা থাকে না? সে জায়গায় আমাদের রাতে শোয়ার ব্যবস্থা করা হলো। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আমাদের সঙ্গে ছিলেন, আমরা সবাই শুয়ে আছি, ফাঁকা জায়গার মধ্যে শুয়ে আছি, গারদের বাইরেই শুয়ে আছি।
এমন সময় দেখি ঢাকার কোনো জায়গা থেকে এক ড্রাগ লর্ডসহ এক মহিলাকে ধরে আনা হয়েছে। আমি চোখ খুলে দেখি যে সেই মহিলা একদম আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। মহিলা গারদও ভর্তি, তারও গারদে জায়গা নাই, তিনিও দাঁড়িয়ে আছেন। তখন আমি আমার সহযোদ্ধাকে বললাম, আমি একজন অধ্যাপকের ছেলে, রাজনীতি করতে এসে আজকে আমার এই অবস্থা যে, একজন ড্রাগ লর্ডের পাশে আমার শুয়ে থাকতে হয়! এরকম অনেক ঘটনাই তো ঘটেছে।
তারপর ওখানে আওয়াজ পেয়েছি। নেতাদের চিৎকার, তাদের মারা হচ্ছে, তাদের ওপর আঘাত করা হচ্ছে। তারপর আমাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন হয়েছে, মেন্টাল প্রেশার, কী অবস্থার মধ্যে পড়েছি! একটা সময় এমন হয়েছে, আমরা বুঝতে পারছি যে, আমাদের হঠাৎ করে চালান করা হবে এখান থেকে অন্য জায়গায়। গভীর রাতে নিয়ে যাওয়া হবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। আমরা ভাবতেছি যে, হয়তোবা আমাদের গুম করছে। হয়তোবা এটাই আমাদের শেষ সময়। বাট আনফরচুনেটলি গুম হই নাই। এরকম গুম হওয়ার মতো সিচুয়েশন আমরা বহুবার ফেস করেছি।
একবার আমাদের হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে রাতের বেলা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এত রাতে তো কখনো নিয়ে যায় না, নিয়ে যায় কেন্দ্রীয় কারাগারে। আমরা সারাক্ষণ গাড়ির মধ্যে চিন্তায় আছি বোধহয় যে কোনো সময় আমাদের যে কোনো জায়গায় নামিয়ে কিল করে দেওয়া হবে বা গুম করে দেওয়া হবে। আমরা সবাই মোটামুটি এই চিন্তার মধ্যে আছি। এর মধ্যে ফরচুনেটলি দেখলাম যে, কোনোভাবে খবর পেয়ে এক সাংবাদিক হোন্ডা নিয়ে আমাদের ভ্যানের পেছনে পেছনে আসতেছে। তাকে দেখার পর আমরা জাস্ট নিশ্চিন্ত হলাম যে, এটলিস্ট এখন কিছু ঘটানোর সাহস পাবে না বা ঘটলেও জাতি জেনে যাবে। গুম করতে পারবে না। এরকম সিচুয়েশনে আমরা বহুবার পড়েছি।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের মুক্তির দাবিতে নেতাকর্মীদের বিক্ষোভ, ফাইল ছবি
জাগো নিউজ: সেই সংকটের সময়ে- এই যে জেল-জুলুম, হুলিয়া, রাজপথে নির্যাতন, গারদে নির্যাতন এগুলোর কষ্ট বেশি? নাকি দল ক্ষমতায় আসার পর নেতাকর্মীরা এসে যখন প্রশ্ন করেন যে, ‘ভাই আপনার তো এটা হওয়ার কথা ছিল, আপনার তো আজ এমপি-মন্ত্রী থাকার কথা ছিল’, কোনটা বেশি কষ্টের?
হাবিব উন-নবী-খান সোহেল: যদি আপনার মনের মধ্যে কোনো প্রত্যাশা থাকে যে আমি এটা হবো, ওটা হবো, আমি মন্ত্রী হবো— এই প্রত্যাশা যদি আপনার মনের মধ্যে থাকে, তখনই আপনার খারাপ লাগবে। আপনার মনের মধ্যে যদি এ ধরনের প্রত্যাশা না থাকে, ধুর! কী হইছে? আমরা তো পলিটিক্স করি, যে যে প্ল্যাটফর্মে থাকি রাজনীতি করে যাবো। কী পেলাম কী পেলাম না, এটা তো বিষয় নয়। দল করি, দল প্রয়োজন মনে করলে দেবে, না দিলে নাই।
আমার তো ওই এরশাদের মন্ত্রীর মতো লুটপাট বা শেখ হাসিনার মন্ত্রীর মতো মন্ত্রী হয়ে লুটপাট করে সুইস ব্যাংকে টাকা জমানো, ওরকম কোনো চিন্তা আমার মাথায় কখনোই নাই। এটা কোনো আকর্ষণীয় পোস্ট, ওখানে গেলেই আমি ধনী হয়ে যাবো, আমার তো ওরকম চিন্তা নাই। আমি বরং এখন যেমন আছি, যদি কোনো সময় মন্ত্রী হওয়ার সুযোগ হয়, আমি তো এরকমই থাকবো। সুতরাং আমার কাছে তো কোনো ডিফারেন্স নাই। এজন্য এগুলোর প্রতি আমার খুব একটা আগ্রহও নাই। সুতরাং আমাকে এ ধরনের প্রশ্ন করে কোনো লাভ নেই। আমি আছি, দল যখন প্রয়োজন মনে করবে বানাবে, না দিলে নাই, সো হোয়াট!
এসইউজে/এমএমএআর/এমএফএ
বিজ্ঞাপন