ব্রেকিং নিউজ
বিএনপি নেতা ছুরিকাঘাতের দায়ে প্রধান শিক্ষক গ্রেফতার সুপারি গাছে উঠতে না চাওয়ায় কিশোরকে ছুরিকাঘাতে হত্যা ‘মজলুমদের হাত দিয়ে যে আইন হচ্ছে, তা গুমের পথ সুগম করবে’ মেছো বিড়াল নিয়ে মানুষকে কেন সচেতন করছে চুয়াডাঙ্গার সংগঠন ‘পানকৌড়ি’ পাকিস্তানে কিছুই বদলায়নি, এখনো সেই একই গল্প: হামিন আহমেদ বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণে বিনিয়োগে আগ্রহী মারস্ক লাইন তৃণমূলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের দৃষ্টান্ত বিএনপিই তৈরি করেছে: আলাল দক্ষিণ সুরমায় পূর্ণাঙ্গ স্টেডিয়াম হবে: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী কুড়ালের ভয় দেখিয়ে গৃহবধূকে ধর্ষণের চেষ্টা, গ্রেপ্তার ১ যশোরে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদির হাসপাতালে মৃত্যু
জাতীয়

মেছো বিড়াল নিয়ে মানুষকে কেন সচেতন করছে চুয়াডাঙ্গার সংগঠন ‘পানকৌড়ি’

P
Prothom Alo অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad

চুয়াডাঙ্গা শহরতলির গ্রাম বেলগাছি। গ্রামের বকচর বিল তখন ধানে ধানে ভরে আছে। একদিন বিলের পাশে একটি প্রাণীকে ঘোরাফেরা করতে দেখলেন কৃষকেরা। অনেকে ছোট জাতের ‘বাঘ’ ভেবে বসলেন। কিছুদিন পর বিলের পাশে আবার দেখা গেল প্রাণীটিকে। এবার তার সঙ্গে তিনটি ছানা। এলাকায় কৌতূহলের পাশাপাশি আতঙ্কও ছড়িয়ে পড়ল।

কিছুদিন পর বকচর বিলের ধান কাটা শেষ হলো। এক রাতে শুরু হলো প্রচণ্ড কালবৈশাখী। সকালে কৃষকেরা ধানখেতে পেলেন একটি ছানা। ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে মা প্রাণীটি হয়তো দুটি ছানাকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে পারলেও একটিকে ফেলে গেছে। কৃষকেরা ছানাটিকে আটকে রাখলেন খাঁচায়।

এই খবর পেয়ে ছুটে এলেন বখতিয়ার হামিদ। দেখলেন, ছানাটি আসলে মেছো বিড়ালের। গ্রামের ছেলে বখতিয়ার হামিদ চুয়াডাঙ্গা সদরের গাইদঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তিনি ও তাঁর বন্ধুরা মিলে বেলগাছি গ্রামের প্রাণপ্রকৃতি রক্ষার কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁদের উদ্যোগে গ্রামটি পরিচিতি পেয়েছে প্রাণপ্রকৃতির অভয়ারণ্য হিসেবে।

ছানাটি উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে গেলেন বখতিয়ার।

বছর দশেক আগের সেই ঘটনা সবিস্তার বলেন বখতিয়ার, ‘আমার মনে হলো, রাতে বৃষ্টি হয়েছে, মাটিও নরম। তাই মা মেছো বিড়ালের পায়ের ছাপ অনুসরণ করে তার সর্বশেষ গন্তব্য খুঁজে বের করা সম্ভব।’

সেদিন বিকেলেই অনুসন্ধানে বের হলেন হামিদ। পেয়েও গেলেন। ধানখেত থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে একটি পানবরজের মাটিকাটা গর্তের আশপাশে ছিল মা ও দুই ছানার সর্বশেষ বিচরণস্থল। রাত আটটার পর একা সেখানে গিয়ে ছানাটিকে ছেড়ে এলেন বখতিয়ার হামিদ। মেছো বিড়ালছানাটির শরীরের গন্ধই জানান দিচ্ছিল, মা হয়তো আশপাশেই কোথাও আছে।

খুব সকালে আবার সেখানে গিয়ে পায়ের ছাপ দেখে নিশ্চিত হলেন, মা তার ছানাকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে গেছে।

সেদিনের অভিজ্ঞতার পর আরও কিছু ঘটনা নজরে আসে বখতিয়ারের। অনেকে মেছো বিড়ালকে আক্রমণাত্মক প্রাণী ভেবে মেরে ফেলেন। অথচ প্রাণীটি তা নয়। মানুষের এই নেতিবাচক ধারণা দূর করতে প্রাণীটি নিয়ে কাজ করার আগ্রহ তৈরি হলো বখতিয়ার হামিদের। তাঁদের গড়া সংগঠন ‘পানকৌড়ি’র উদ্যোগে শুরু হলো সেই কাজ।

বাঘ নয়, মেছো বিড়াল

মেছো বিড়াল রক্ষায় দেয়ালচিত্র

এই এক দশকে ‘পানকৌড়ি’ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৪০টির বেশি মেছো বিড়াল উদ্ধার ও অবমুক্ত করেছে। এর মধ্যে কিছু মেছো বিড়ালকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে অবমুক্ত করা হয়েছে।

দু-একটি গল্প শোনালেন বখতিয়ার। এর মধ্যে আলমডাঙ্গার জামজামি ইউনিয়ন থেকে আঘাতপ্রাপ্ত একটি মেছো বিড়াল উদ্ধারের ঘটনা রয়েছে। প্রাণীটির স্নায়বিক সমস্যা ছিল। অভিজ্ঞ পশুচিকিৎসকের পরামর্শে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর সেটিকে খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগে পাঠানো হয়। পরে সেখানে উন্নত চিকিৎসা দিয়ে প্রাণীটিকে সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়।

বছর দুয়েক আগে সড়ক দুর্ঘটনায় একটি মেছো বিড়ালের চোয়াল ও এক চোখে আঘাত লাগে। সেটিকেও চিকিৎসা দিয়ে কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর অবমুক্ত করা হয়। প্রাণীটি টিকে থাকতে পারছে কি না, তা জানতে জায়গাটি কিছুদিন পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল। তবে পরে তেমন কোনো দুঃসংবাদ পাওয়া যায়নি।

মেছো বিড়াল মারা পড়ার অন্যতম কারণ, মানুষের চোখে সেটিকে ‘বাঘ’ হিসেবে চিহ্নিত করা। এই ‘কলঙ্ক’ দূর করতে অনেক দিন ধরেই সচেতনতামূলক কাজ করছে ‘পানকৌড়ি’।

চুয়াডাঙ্গার স্কুল ও গ্রামাঞ্চলের হাটবাজারে পথসভা করা হচ্ছে। মেছো বিড়ালের ছবি ও তথ্যসংবলিত বিলবোর্ড স্থাপন, বিভিন্ন যানবাহনে স্টিকার লাগানো, পোস্টার ও প্রচারপত্র বিতরণ চলছে। জেলার ইউনিয়নগুলোতে, এমনকি প্রত্যন্ত এলাকাতেও মাইকিং করা হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে স্কুল, কলেজ ও গ্রামাঞ্চলের হাটবাজারের রাস্তার পাশে দেয়ালে আঁকা হয়েছে মেছো বিড়ালের গ্রাফিতি। এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য, মেছো বিড়াল সম্পর্কে মানুষের ভুল ধারণা দূর করা এবং প্রাণীটির সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা।

মেছো বিড়াল সংরক্ষণ ও প্রাণীটি নিয়ে গবেষণার কাজে ‘পানকৌড়ি’র সঙ্গে যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ। সহযোগিতা করছে আরণ্যক ফাউন্ডেশন।

গবেষণার অংশ হিসেবে সাক্ষাৎকার, জরিপ ও ক্যামেরা ট্র্যাপিং চলছে। এসব কাজের মধ্য দিয়ে মেছো বিড়ালের জীবনধারা সম্পর্কে একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করার আশা করছে ‘পানকৌড়ি’।

প্রচারণা চালিয়ে কেমন সাড়া মিলছে, জানতে চাইলে বখতিয়ার হামিদ বলেন, এসব উদ্যোগের ফলে বন বিভাগ ও ‘পানকৌড়ি’র হটলাইন নম্বর এখন প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে। মৌসুমভেদে মেছো বিড়াল বিষয়ে সপ্তাহে দু-তিনটি ফোন আসে।

বখতিয়ার হামিদ তাঁর বন্ধুদের নিয়ে বেলগাছি গ্রামের প্রাণপ্রকৃতি রক্ষার কাজ করে যাচ্ছেন

পানকৌড়ির এই কাজে যুক্ত আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুনতাসীর আকাশ। তিনি বলেন, আগে গ্রামীণ ঝোপঝাড় ও জলাভূমির পরিমাণ বেশি ছিল। মেছো বিড়াল সেখানে নিজেদের লুকিয়ে রাখার সুযোগ পেত। এখন এসব জায়গা কমে যাওয়ায় তাদের আবাস ও আশ্রয়স্থল সংকুচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে খাদ্যসংকটও তৈরি হচ্ছে। এ কারণে খাদ্যের সন্ধানে মেছো বিড়াল ফিশ ফার্ম, পোলট্রি ফার্ম ও লোকালয়ের আশপাশে চলে আসছে। ফলে মানুষের সঙ্গে তাদের দেখা হওয়ার ঘটনাও বাড়ছে।

মেছো বিড়াল মূলত ছোট আকারের একটি বন্য বিড়াল। হাওর-বাঁওড় ও জলাভূমির আশপাশে থাকে। ফসলি জমি, বিশেষ করে ধানখেত, ভুট্টা, পাট ও ঘাসের জমির আল ধরে এরা বিচরণ করে। তবে প্রজনন মৌসুমে লোকালয়ের কাছাকাছি অবস্থান নেয়।

মেছো বিড়াল মূলত মাছ খায়। এ ছাড়া ফসলের ইঁদুর, ব্যাঙ, সাপ ও কাঁকড়াও খায়।

বখতিয়ার হামিদ বলেন, মানুষ দেখলেই মেছো বিড়াল আক্রমণ করতে আসে না। বরং মানুষ দেখলে অনেক সময় এদের তেমন কোনো প্রতিক্রিয়াই থাকে না। কখনো ধীরে ধীরে সরে যায়, আবার কখনো চুপ করে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। আর তখনই মানুষ ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তবে কোনো পরিস্থিতিতে প্রাণীটি নিজেকে অনিরাপদ মনে করলে আত্মরক্ষার চেষ্টা করতেই পারে। পানকৌড়ির সংগঠকদের বিশ্বাস, সচেতনতামূলক কাজের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। মানুষ মেছো বিড়ালের প্রতি আরও সদয় হবে।

বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>