বিজ্ঞাপন
প্রকৃতির অপরূপ লীলাভূমি রেমা-কালেঙ্গা গহিন অরণ্য। চারদিকে শুধু সবুজের সমারোহ। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বনাঞ্চলটিতে আছে দুর্লভ জাতের গাছ। আছে দুর্লভ অনেক প্রাণীও। গাছের মগডালে প্রায়ই দেখা মেলে বিরল জাতের অসংখ্য প্রাণীর। অবাধে বিচরণ করে তারা। পর্যটক ও প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করে এ বনের সৌন্দর্য। কয়েক বছর আগেও বনে ভ্রমণপিপাসুদের থাকার ব্যবস্থা ছিল না। এখন সেখানে আছে একাধিক কটেজ। যাতে রাতে অবস্থান করারও ব্যবস্থা আছে। হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এ বনের অবস্থান। জেলার সীমানা ছাড়িয়ে বনটি বিস্তৃত হয়েছে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য পর্যন্ত।
রেমা-কালেঙ্গার অবস্থান ও দূরত্ব
সুন্দরবনের পরে আয়তন এবং প্রাচীনতার দিক থেকে রেমা-কালেঙ্গার অবস্থান দ্বিতীয়। রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য বাংলাদেশের একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য। এটি একটি শুকনো ও চিরহরিৎ বন। জীব ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্যে দেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ বনাঞ্চল এটি। রেমা-কালেঙ্গা বনাঞ্চলকে অভয়ারণ্য হিসেবে ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে ১৯৯৬ সালে এটি সম্প্রসারণ করা হয়। বর্তমানে এ অভয়ারণ্যের আয়তন ১৭৯৫.৫৪ হেক্টর। বাংলাদেশের যে কয়েকটি প্রাকৃতিক বনভূমি এখনো মোটামুটি ভালো অবস্থায় টিকে আছে, রেমা-কালেঙ্গা তার মধ্যে অন্যতম। গোটা অঞ্চল রেমা, কালেঙ্গা, ছনবাড়ি ও রশিদপুর বিটে ভাগ করা হয়েছে। বিস্তীর্ণ অঞ্চলটি যেহেতু প্রাকৃতিক বনাঞ্চল, এজন্য বনের দেখভালের জন্য আছে ১১টি ইউনিট ও ৭টি ক্যাম্প।
বনে যা আছে
রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য বিরল প্রজাতির জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। এ বনে ৩৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ২১৫ প্রজাতির পাখি, সাত প্রজাতির উভচর, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৬৩৮ প্রজাতির গাছপালা ও লতাগুল্ম পাওয়া যায়। বিভিন্ন বিরল প্রজাতির পাখির জন্য এ বন সুপরিচিত। এদের মধ্যে আছে ভীমরাজ, টিয়া, পাতি ময়না, লালমাথা কুচকুচি, সিপাহি বুলবুল, রাজ ধনেশ, শকুন, কালো মথুরা, লাল বনমোরগ, প্যাঁচা, মাছরাঙা, ঈগল, চিল প্রভৃতি।
আরও পড়ুন
একদিনে পাহাড়-ঝরনা ও সমুদ্র ভ্রমণ করতে কোথায় যাবেন?
বনে তিন প্রজাতির বানরের বাস। এগুলো হলো উল্টোলেজি বানর, লাল বানর ও নিশাচর লজ্জাবতী বানর। এ ছাড়া এখানে পাঁচ প্রজাতির কাঠবিড়ালি দেখা যায়। এর মধ্যে বিরল প্রজাতির মালয়ান বড় কাঠবিড়ালি একমাত্র এ বনেই পাওয়া যায়। বন্যপ্রাণীর মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য আরও আছে মুখপোড়া হনুমান, চশমাপরা হনুমান, উল্লুক, মায়া হরিণ, মেছোবাঘ, দেশি বন শূকর, গন্ধগোকুল, বেজি, সজারু ইত্যাদি। শঙ্খচূড়, দুধরাজ, দাঁড়াশ, লাউডগা প্রভৃতিসহ এ বনে আঠারো প্রজাতির সাপের দেখা পাওয়া যায়। গাছের মগডালে অবাধে বিচরণ করে এসব সাঁপ, পাখি, কাঠবিড়ালি, বানর ও হনুমান।
ঘন সবুজের আড়ালে অন্য জগৎ
ঘন সবুজের আড়ালে যেন লুকিয়ে আছে অন্য জগৎ। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো মাটিতে এসে পড়ছে। চারদিকে নীরবতা। সে নীরবতার মধ্যেই হঠাৎ গাছের উঁচু ডালে চোখে পড়ে অস্বাভাবিক বড় বড় কাঠবিড়ালি। দীর্ঘ লেজ আর বিশাল শরীর নিয়ে ডাল থেকে ডালে ছুটে বেড়াচ্ছে প্রাণীগুলো। এমন দৃশ্যই নিত্যদিনের। প্রাণীটি সাধারণ কাঠবিড়ালি নয়। এটি মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেল। বাংলাদেশে পাওয়া কাঠবিড়ালি প্রজাতির মধ্যে অন্যতম বড়। পূর্ণবয়স্ক প্রাণীর শরীরের দৈর্ঘ প্রায় ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। লেজও প্রায় শরীরের সমান লম্বা। ফলে মাথা থেকে লেজের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত দৈর্ঘ এক মিটারের বেশি হতে পারে। ওজন প্রায় দুই কেজি পর্যন্ত হওয়ার তথ্য আছে। কালো, বাদামি কিংবা লালচে-মেরুন রঙের শরীর এবং ঘন ঝোপালো লেজ প্রাণীটিকে অন্য কাঠবিড়ালি থেকে সহজেই আলাদা করে। গাছের মগডালে দ্রুত চলাচলের সময় লম্বা লেজটি ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সুবাস চন্দ্র দেব জাগো নিউজকে বলেন, ‘বড় ও পুরোনো গাছ সংরক্ষণ ছাড়া জায়ান্ট স্কুইরেলের মতো প্রাণীকে টিকিয়ে রাখা কঠিন। গহিন বন ও প্রবীণ বৃক্ষ কমে গেলে এসব প্রাণী একই সঙ্গে খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয় হারাবে।’
আরও পড়ুন
ভিন্ন স্বাদ নিতেই অপরিকল্পিত বান্দরবান ভ্রমণ
কর্তৃপক্ষ যা বলে
কালেঙ্গা বিট কর্মকর্তা আল আমিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘রেমা-কালেঙ্গায় মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেলের উপস্থিতি বনের জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের বিরল প্রাণীর অস্তিত্ব প্রমাণ করে অভয়ারণ্যটি এখনো বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হিসেবে টিকে আছে। বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় স্থানীয়দের সহযোগিতা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘একসময় বনে পর্যটকদের জন্য তেমন সুযোগ-সুবিধা ছিল না। এখন থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। বনকে ঘিরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গবেষণা করেন। তবে পর্যটকদের সতর্ক থাকতে হবে, যেন বন্যপ্রাণীরা ভয় না পায়। তাদের ভয় দেখানো থেকে বিরত থাকতে হবে। সাবধনতার সাথে নীরবে বনের নির্ধারিত ট্রেইলে ভ্রমণ করলে অনেক বিরল প্রাণীর দেখা পাওয়া যায়।’
বন্যপ্রাণী প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবুল কালাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সচেতন নাগরিকদের সহযোগিতাও প্রয়োজন। বনকে স্বাভাবিকভাবে বাড়তে দেওয়া উচিত। বন নষ্ট হয় এমন কাজ করা যাবে না। গাছ কাটা যাবে না। পর্যটকদেরও সাবধানে নীরবে নির্ধারিত ট্রেইলে ভ্রমণ করতে হবে। যাতে বণ্যপ্রাণীরা ভয় না পায়। এসব প্রাণী প্রকৃতিপ্রেমীদের আনন্দ দেয়। মনের প্রশান্তি দেয়।’
আরও পড়ুন
সাতলা বিলের লাল শাপলায় পর্যটনের হাতছানি
যাতায়াত ব্যবস্থা
রাজধানী ঢাকা থেকে সড়ক পথে এর দূরত্ব প্রায় ১৩০ কিলোমিটার। হবিগঞ্জ জেলা সদর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে বাস অথবা ট্রেনে করে শায়েস্তাগঞ্জ নেমে সিএনজি অটোরিকশাযোগে চুনারুঘাট যেতে হবে। এরপর সেখান থেকে অপর একটি সিএনজি নিয়ে যেতে হবে রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যে। অথবা শায়েস্তাগঞ্জ থেকে সিএনজি অটোরিকশা রিজার্ভ ভাড়া নিয়ে সরাসরিও সেখানে পৌঁছানো যায়। এ ক্ষেত্রে শায়েস্তাগঞ্জ থেকে খরচ প্রায় ৫০০ টাকা হতে পারে।
সুযোগ-সুবিধা
রেমা-কালেঙ্গায় গত কয়েক বছর আগেও থাকার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এখন সেখানে বেশ কয়েকটি কজেট আছে। এগুলো আগে থেকে বুকিং দিয়ে রাখলে দিনে এবং রাতে অবস্থান করা যায়। রাতে বনের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। রাতে অবস্থান করলে দেখা মেলে অনেক বিরল প্রাণীর। বাঘ, হরিণ, খরগোশসহ বিভিন্ন প্রাণীর দেখা মেলে ভোরে। খাওয়ার জন্য একটি রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখানে আগে থেকে অর্ডার করে রাখতে হয়।
ইআরকে/এসইউ
বিজ্ঞাপন