বিজ্ঞাপন
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেদিন (শনিবার) লুট হওয়া অস্ত্রের বিষয়ে তথ্য দিলে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কারের ঘোষণা দিলেন, সেদিন রাতেই বাসায় ফিরে একটি টেলিভিশনের স্ক্রিনে দেখতে পাই ‘সুড়ঙ্গ’ নামে একটি বাংলা সিনেমা চলছে। যে সিনেমাটির প্রশংসা শুনেছিলাম, কিন্তু দেখার সুযোগ হয়নি। ফলে মাঝপথ থেকেই সিনেমাটা দেখা শুরু করি।
সিনেমার মূল বিষয় হলো, একজন অপরাধী সুড়ঙ্গ খুঁড়ে ব্যাংকের ভল্ট থেকে টাকা লুট করেছে। এ বিষয়ে তথ্য দিতে পারলে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে পুলিশ। টেলিভিশনে এই খবর দেখে এক দম্পতি থানায় গিয়ে লুটকারীর পরিচয় বলে দেয় এবং পুলিশ পাঁচ লাখ টাকা দেয়ার বদলে তাদের লকাপে ঢুকায়। কারণ স্বভাবতই পুলিশের মনে এই প্রশ্ন তৈরি হয় যে, ব্যাংকের ভল্ট থেকে টাকা লুটের ব্যাপারে যার নাম বলা হচ্ছে, নিশ্চয়ই তাকে এই দম্পতি চেনে। অতএব তাদের কাছ থেকে আরও তথ্য আদায়ের জন্য পুলিশ তাদের আটক করে।
শুধু সিনেমা নয়, বাস্তবেও কেউ যদি এরকম ব্যাংক লুটের ব্যাপারে পুলিশকে তথ্য দেয়, তাহলে পুলিশ অধিকতর তদন্ত এবং নিশ্চিত হওয়ার স্বার্থে তাদেরকে আটক করবে। সুতরাং, অপরাধীর ব্যাপারে তথ্য দিলে পুরস্কার ঘোষণা করা হলেও বাস্তব জীবনে মানুষ সাধারণত থানায় গিয়ে পুলিশকে তথ্য দেয় না বা পরিচয় গোপন রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও কেউ ঝুঁকি নিয়ে মোবাইল ফোনেও কোনো তথ্য দেবে না। কারণ যিনি তথ্য দেবেন, পুলিশের মনে প্রথমেই প্রশ্ন উঠবে, তিনি কী করে জানলেন? ফলে কেউ তথ্য জানলেও পুলিশকে দিতে চায় না মূলত উল্টো হয়রানির ভয়ে।
এবার আসা যাক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণা প্রসঙ্গে। শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে রাজারবাগ পুলিশ অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, অবৈধ ও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের বিশেষ একটি ইউনিট গঠন করা হয়েছে। এসব অস্ত্রের সন্ধান দিতে তথ্যদাতাদের ১০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, গত ২১ জানুয়ারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জানান, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সারা দেশের বিভিন্ন থানা থেকে মোট ৩ হাজার ৬১৯টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। এসব অস্ত্রের মধ্যে তখন পর্যন্ত ২ হাজার ২৫৯টি বা ৬২ দশমিক ৪ শতাংশ উদ্ধার করা হয়। সেনাপ্রধান আরও বলেন, একই সময়ে মোট ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪১৮ রাউন্ড গুলি লুট হয়। যার মধ্যে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত ২ লাখ ৩৭ হাজার ১০০ রাউন্ড বা ৫২ শতাংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়। (ডেইলি স্টার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬)।
অবশ্য পুলিশ সদরদপ্তরের বরাত দিয়ে গত শনিবারত রাতে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের খবরে বলা হয়, চব্বিশের ৫ আগস্ট এবং তার আগের দিন থানাসহ পুলিশের ৪৬০টি স্থাপনায় হামলা চালিয়ে ৫ হাজার ৮২৯ টি অস্ত্র লুট করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সাব মেশিন গান, চাইনিজ রাইফেলসহ বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র। যার মধ্যে ১ হাজার ৩২৬টি অস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার গুলি এখনও উদ্ধার হয়নি।
প্রশ্ন হলো, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ঘোষণায় কি এটা প্রমাণিত হয় যে, অস্ত্র উদ্ধারের দায়িত্ব যাদের, সেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই কাজে ব্যর্থ হয়েছে বলেই সরকার এখন জনগণের সহযোগিতা চাচ্ছে? তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, সাধারণ মানুষ কীভাবে অস্ত্রের সন্ধান দেবে? অপরাধীরা কি কাউকে জানায় যে তার কাছে অস্ত্র আছে? মানুষ কী করে জানবে যে কার কাছে লুটের অস্ত্র আছে? মানুষ কি ধারণা করে বলবে যে অমুকের কাছে লুটের অস্ত্র থাকতে পারে? যদি তাই হয় এবং পুলিশ যদি কোনো ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কোনো নিরপরাধ মানুষকে ধরে নিয়ে আসে, তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে? তাহলে কি লুটকারীরা থানায় গিয়ে অস্ত্র জমা দিয়ে আসবে? সেটি কি বাস্তবসম্মত?
পুলিশকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা কি বন্ধ হয়েছে? পুলিশের মধ্যে ঘুস-দুর্নীতিসহ অন্যান্য অপরাধপ্রবণতা কি মোটেও কমেছে? এসব প্রশ্নের উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় এই পুলিশ বাহিনী আখেরে কতটা সফল হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
এটা ঠিক যে, অপরাধী বা যোদ্ধারাও অনেক সময় সরকারের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে আসে। কিন্তু তার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। রাষ্ট্রের কাছে অস্ত্র জমা দেয়ার ঘটনা ঘটে কেবল একটি সশস্ত্র সংগ্রামের পরে। যেমন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম অস্ত্র জমা দেয়ার ঘটনা ঘটেছে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পরে। যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে দেশমাতৃকার জন্য লড়াই করেছেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে সেই মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র ফেরত দিয়ে দেশ গড়ার কাজে নেমে পড়েন। যদিও তখনও অনেকে অস্ত্র জমা দেননি। যেগুলো পরবর্তীতে নানা ধরনের অপরাধমূলক কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে অস্ত্র জমাদানের আরেকটি বড় ঘটনা ঘটেছে ১৯৯৭ সালে পার্বত্য অঞ্চলের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সরকারের শান্তিচুক্তির পরে। এরপরে সুন্দরবনের দস্যুদের অনেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন। যদিও এখনও সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরে অনেক দস্যু সক্রিয়। তারা নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। অনেকে মাঝেমধ্যে ধরা পড়লেও এইসব সক্রিয় অপরাধীদের কাছে কী পরিমাণ অস্ত্র, বিশেষ করে আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান সরকারের কাছেও নেই। কেননা, থানা থেকে লুট করা অস্ত্রের চেয়ে বিদেশ থেকে চোরাই পথে আসা অস্ত্রের ব্যবহারই বেশি হয়। মূলত চোরাচালানের একটি বড় পণ্যই হলো এই অস্ত্র।
প্রশ্ন হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর এবং বিএনপি সরকারের ছয় মাসসহ মোট দুই বছরেও কেন লুট হওয়া অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা গেল না? বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কি এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল? ওই সরকারের আমলে যিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এবং আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ছিলেন, তারা কি যথেষ্ট সক্ষম এবং অস্ত্র উদ্ধারে যথেষ্ট আন্তরিক ছিলেন?
অভ্যুত্থানের দুই বছর পরেও যখন দুই তৃতীয়াংশ ভোটারের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসা একটি নির্বাচিত সরকারকে লুট হওয়া অস্ত্রের বিষয়ে সন্ধান দেয়ার জন্য পুরস্কারের ঘোষণা দেয়া হয়, তখন বুঝতে হবে অস্ত্র উদ্ধারের দায়িত্ব যাদের, সেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতায় যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তাছাড়া জুলাই অভ্যুত্থানে অনেক পুলিশ সদস্য নিহত, থানায় হামলা চালিয়ে গর্ভবর্তী পুলিশ সদস্যকেও নির্মমভাবে খুন, পুলিশকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখা, অভ্যুত্থানের পরে অসংখ্য পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা এবং বিচারের মুখোমুখি করাসহ নানা কারণে পুলিশের মনে যে ভয় ঢুকেছে; তাদের যেভাবে মনোবল ভেঙে গেছে—সেই অবস্থায় তাদের পক্ষে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে সংস্কারের ধারাবাহিকতায় পুলিশ সংস্কারের জন্যও একটি কমিশন গঠন করা হয়েছিল। যে কমিশন অনেকগুলো সুপারিশ করেছিল। তার মধ্যে কতটি সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়েছে, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, বিএনপি সরকার কি আদৌ ওই সুপারিশ আমলে নিয়েছে বা নেবে? পুলিশকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা কি বন্ধ হয়েছে? পুলিশের মধ্যে ঘুস-দুর্নীতিসহ অন্যান্য অপরাধপ্রবণতা কি মোটেও কমেছে? এসব প্রশ্নের উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় এই পুলিশ বাহিনী আখেরে কতটা সফল হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
লেখক : সাংবাদিক ও লেখক।
এইচআর/জেআইএম
বিজ্ঞাপন