বিজ্ঞাপন
খন্দকার বদিউজ্জামান বুলবুল
শহরের কংক্রিটের জঞ্জাল ও বিরক্তিময় পরিবেশ এবং কোলাহলপূর্ণ জীবনে এক চিলতে ফুরসত পেতে কার না ভালো লাগে! তাই তো রুটিন জীবনের একগুয়েমি ও ক্লান্তি পেছনে ফেলে আনন্দ মোহন কলেজ, কাজী নজরুল ইসলাম হল, প্রথম ফ্লোরের ভাইয়েরা মিলে ছুটে চললাম প্রকৃতির স্বর্গরাজ্য সুসং দুর্গাপুর। আমাদের যাত্রাটা ছিল বেশ কাকতালীয়।
রাতে হুট করেই পরামর্শ আড্ডা ভোর হতেই রওয়ানা ময়মনসিংহ জংশনের উদ্দেশ্য ট্রেনে চেপে জারিয়া হয়ে আমাদের গন্তব্যে যাওয়া কিন্তু বাদ সাধলো ট্রেন! সকালে এসে জানতে পারলাম, ট্রেন জারিয়া যাবে না। এরপর আমরা ময়মনসিংহ শহরের ব্রিজ পাড় গিয়ে বিরিশিরিগামী লোকাল বাসে চেপে সুসং দুর্গাপুর গমন করি। আঁকাবাঁকা পথ, নদীর স্বচ্ছ জলরাশি ও সারিবদ্ধ পাহাড়-টিলা বেষ্টিত এক বৈচিত্র্যময় জনপদ সুসং দুর্গাপুর। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য আর সংস্কৃতির সংমিশ্রণে অন্যন্য নৈসর্গিক সৌন্দর্যের উপাদান হয়ে উঠেছে জনপদটি।
সকালের রৌদ্রতাপ তখনো প্রখর হয়নি, আবছা মেঘ ভর করেছে আকাশে এমন সময় আমরা সুসং দুর্গাপুর বাসস্ট্যান্ডে নেমে সোমেশ্বরী নদীর বালুকাময় জলরাশি পেরিয়ে স্থানীয় নৌকাযোগে নদীর অপরপ্রান্তে পৌঁছালাম। আমাদের গন্তব্য বিজিবি ক্যাম্প। ইজিবাইক যোগে বিজিবি ক্যাম্পে পৌঁছে আমরা সকালের নাশতা সেরে আবারও স্বচ্ছ সলিল ও বালুকাময় সোমেশ্বরী নদী হয়ে আদিবাসী গ্রামে পৌঁছাই। এখানকার আদিবাসী গ্রামের সৌন্দর্য ও আদিবাসী মার্কেট খুব সজ্জিত। হরেক রকম মানুষের আনাগোনায় সব সময় মুখরিত থাকে গ্রামটি।
আরও পড়ুন
শরতের শুভ্র মেঘমালা আর কাশফুলের মাঝে কিছুক্ষণ
সাজানো ও পরিপাটি। সেই সাথে ছায়া সুনিবিড় গ্রামখানি। গারো পাহাড়ের সৌন্দর্য এখান থেকে প্রতীয়মান। শোনা যায়, এখানে মাঝে মাঝে বন্যহাতি নেমে আসে। এমন শান্ত সুশীতল গ্রামে আমাদের কিছুটা সময় অতিবাহিত হলো। এখান থেকে খানিক কেনাকাটা করে ভবানীপুরের সীমান্ত ঘেঁষা গ্রামগুলো ঘুরে বেড়াই। গ্রামগুলো সত্যি মনোমুগ্ধকর। এখানে অনেক দূরে দূরে বাড়ি বা লোকালয়। একসাথে অনেকগুলো ঘরবাড়ি। আবার যেখানে নেই; সেখানে একটিও বাড়ি নেই।
এখানকার যাতায়াত ব্যবস্থা তেমন উন্নত না হলেও মন্দ নয়। এখান থেকে মেঘালয়ের সুউচ্চ পাহাড় প্রত্যক্ষ করে আমরা ফুটবল খেলার আনন্দে মেতে উঠি। আমাদের ফুটবল খেলার মাঠটি বেশ আকর্ষণীয়। ছবির মতো সুন্দর। মাঠের ডানপাশ ও সামনের দিকে নয়নাভিরাম পাহাড়। সেই সাথে সমতল ও সবুজ ঘাসে মোড়ানো মাঠটি একটি আদর্শ ফুটবল নৈপুণ্য প্রদর্শনের উপযোগী। ফুটবল আমাদের শৈশবের স্মৃতির ডায়েরিতে অমলিন।
গারো পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য অবলোকন করতে করতে আমরা টংক আন্দোলনের রাশিমণি স্মৃতিসৌধের পাশ দিয়ে সাদা মাটির মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করতে বিজয়পুর গমন করি। টংক আন্দোলন একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ছিল। কমরেড মনি সিং-এর নেতৃত্বে এই আন্দোলন বিকশিত হয় ও সাফল্যের মুখ দেখে। এটি একটি উপজাতি সংগঠিত আন্দোলন ছিল। যাওয়ার পথে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনধারা ও পাহাড়ি সৌন্দর্য আমাদের মনে দোলা দিয়ে যায়।
আরও পড়ুন
একদিনে পাহাড়-ঝরনা ও সমুদ্র ভ্রমণ করতে কোথায় যাবেন?
সাদা পাথরের রাজ্যে এসে আমরা দুপুরের খাবার সেরে দিগ্বিদিক ঘুরে বেড়াই। আনন্দময় দৃশ্যগুলো আমরা ফ্রেমবন্দি করে রাখি। এখানে বৃহৎ অট্টালিকা নেই। তবে যা এখানে আছে, তা সহস্র টাকা ব্যয় করেও পাওয়া মুশকিল। সাদা পাথরের পাহাড়ে ঘুরে দেখার পাশাপাশি নান্দনিক লেকে নেমে গোসল সবই স্মৃতির পাতায় অমলিন থাকবে।
সুউচ্চ পাহাড়, নয়নাভিরাম লেক, গর্বের সোমেশ্বরী নদীর স্বচ্ছ জলরাশি, আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা জিরো পয়েন্ট, কংস নদীর অববাহিকা; এমনকি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা স্রোতধারা, আধিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, ঐতিহাসিক টংক আন্দোলনের পীঠস্থান অবলোকন করে আমরা রাতে ময়মনসিংহ শহরে পৌঁছাই।
লেখক: শিক্ষার্থী, আনন্দ মোহন কলেজ, ময়মনসিংহ।
এসইউ
বিজ্ঞাপন