বিজ্ঞাপন
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় দেশে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বা হত্যাকাণ্ডের মামলার সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তবে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অন্যান্য অপরাধের মামলা কমেছে বলে জানান তিনি।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে বর্তমান সরকারের সময়ে বিভিন্ন অপরাধের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি এসব কথা বলেন। ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, আমি বলছি না অপরাধ হচ্ছে না, অপরাধ হচ্ছে। সেগুলো আপনারা আনছেন, এটাও লজিক্যাল, এটাই আনতে হবে। একটা অপরাধও যেন না ঘটে সরকার, বা ঘটলে সেটা দায় সরকারের মানতে আমি একেবারেই দ্বিধা করছি না। কিন্তু আমরা সব কোন জায়গায় আছি, কতটুকু আছি, সেটা আমাদের একটু বোঝা দরকার। তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র ছয় মাসের মতো সময় গেছে। ধীরে ধীরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমস্যাগুলোর সমাধান হবে বলে তারা আশা করছেন। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়নে পুলিশের অতীত ভূমিকা ও বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
আরও পড়ুন
প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী / কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ঘটেছে ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে
ডা. জাহেদ বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনীর একটি বড় অংশের মনোবল ভেঙে গেছে। সেই ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত পুলিশ বাহিনীকে’ নিয়েই সরকার কাজ করছে এবং তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরতে সময় লাগবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান বলেন, বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কি আসলে খুব খারাপ?’ এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কে একটি মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সরকারকে একেবারে ধ্বংসপ্রাপ্ত ও মনোবল হারানো একটি পুলিশ বাহিনী নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। শেখ হাসিনার সরকারের ১৫ বছর এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় পুলিশের একটি অংশ যেভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, তাতে বাহিনীটির ওপর মানুষের আস্থা ও পুলিশের নিজেদের আত্মবিশ্বাস দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, একটা ধ্বংসপ্রাপ্ত পুলিশকে নিয়ে আমরা কাজ করছি আসলে। পুলিশের সদস্যদের সঙ্গে কথা বললে তারা নিজেরাও স্বীকার করেন যে পুলিশের সেই আত্মবিশ্বাস ফিরে আসতে সময় লাগবে।
পুলিশের মনোবল ভাঙার কারণ ‘ইনডেমনিটি’ নয়
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের নিহত সদস্য এবং তাদের বিষয়ে দেওয়া ইনডেমনিটির প্রভাব নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে উপদেষ্টা বলেন, পুলিশের মনোবল ভেঙে যাওয়ার প্রধান কারণ ইনডেমনিটি নয়, বরং অতীতে পুলিশের একটি অংশকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, সেটিই বড় কারণ। তিনি বলেন, প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মচারী বেআইনি কাজ করতে বাধ্য নন। ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তা বেআইনি নির্দেশ দিলেও সেই নির্দেশ পালন করে অপরাধ করলে শুধু ‘আদেশ পালন করেছি’ এটি দায়মুক্তির কারণ হতে পারে না। তিনি আরও বলেন, পুলিশের মনোবল ভাঙার প্রধান কারণ হচ্ছে হোয়াট দে ডিড। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ৫ আগস্টের পর মানুষ ঝুঁকি জেনেও বিভিন্ন থানায় ঘেরাও করতে গিয়েছিল। কিছু ঘটনায় পুলিশের গুলিতে সাধারণ মানুষ হতাহত হন। দীর্ঘ সময় ধরে পুলিশের ওপর মানুষের যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তার পেছনে অতীতের বিভিন্ন ঘটনা রয়েছে। তিনি বলেন, ১৫ বছরে পুলিশকে দিয়ে বিএনপি, কখনো কখনো জামায়াত বা অন্য যেকোনো বিরোধী পক্ষকে নিয়ে টর্চার করানো হয়নি? মামলা দেওয়া হয়নি? গায়েবি মামলা বলে এক বস্তু হয়েছে।
পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া উচিত নয়
পুলিশ বাহিনীর অতীত কর্মকাণ্ডের কারণে বর্তমানে তাদের আইনগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, আমাদের এখন এই প্রবণতা যেন না থাকে যে, পুলিশ বাহিনী আগে কি করেছিল সেটার জন্য আমরা এখন পুলিশ বাহিনীর অথরিটি মানব না। পুলিশ বাহিনী ল-ফুল কোনো কাজ যদি করে, সেই কাজটা তাকে করতে দিতে হবে।
আরও পড়ুন
ত্রাস সৃষ্টি করতেই গেন্ডারিয়ায় এলোপাতাড়ি গুলি করে ২০-২২ জন
নাগরিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, পুলিশের কোনো সদস্য আইনসম্মত দায়িত্ব পালন করলে তাকে সেই দায়িত্ব পালন করতে দিতে হবে। পুলিশকে সহযোগিতা ছাড়া রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, পুলিশ বাহিনীর সাপোর্ট ছাড়া হবে না। একই সঙ্গে তিনি পুলিশ সদস্যদের দেশের মানুষেরই সন্তান, ভাই ও স্বজন হিসেবে বিবেচনা করে তাদের কাজ করার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
নিখোঁজ শিশু নিয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান
ব্রিফিংয়ে নিখোঁজ শিশুদের বিষয়ে সাম্প্রতিক আলোচনার প্রসঙ্গেও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা। তিনি জানান, গত সাত মাসে শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১৭টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর এই সাত মাসে এমন জিডির সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৮৭৬টি। তবে প্রতিটি জিডির অর্থ শিশু আর ফিরে আসেনি এমন নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিখোঁজ শিশুদের একটি বড় অংশ পরবর্তীতে ফিরে আসে। ঠিক কত শিশু আর ফিরে আসেনি, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য সরকারের কাছে নেই বলেও জানান তিনি।
আরও পড়ুন
সপরিবারে শিক্ষক হত্যা / দেরি করে ডোপ টেস্ট, ২ আসামির শরীরে মেলেনি মাদকের আলামত
তিনি বলেন, আমরা হিসাব করতে পারি এর বিরাট একটা অংশ ফেরত আসে। কোনো কোনো পত্রিকা পরে ফলোআপ রিপোর্ট করেছে এবং এটাও মিডিয়ার কাজ আসলে। প্রাপ্তবয়স্ক নিখোঁজের জিডির সংখ্যাও তুলে ধরে তিনি বলেন, গত সাত মাসে প্রাপ্তবয়স্ক ১৩ হাজার ৫৮০ জনের বিষয়ে জিডি হয়েছে। আগের সাত মাসে এ সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৩ জন। অর্থাৎ দুই সময়ের পরিসংখ্যান তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, শিশু নিখোঁজের ঘটনা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়, তবে এটিকে বাংলাদেশের একেবারে নতুন সংকট হিসেবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান বলেন, শুরু থেকেই সংকট মোকাবিলায় কিছু ভুলের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। একে আন্তর্জাতিক ইস্যু হিসেবে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ থাকলেও তৎকালীন সরকার বিষয়টিকে দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছিল। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও এ বিষয়ে আশাব্যঞ্জক কথাবার্তা হলেও কার্যকর অগ্রগতি তেমন হয়নি। তবে বর্তমান সরকার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, আমি আপনাকে এই মুহূর্তে যে সিগনিফিকেন্ট কোনো উন্নতি হয়ে গেছে সেটা বলতে পারছি না, সেটা হয়নি এখনো, কিন্তু এটা নিয়ে কাজ চলছে। আমরা নিশ্চয়ই সমস্যাটা সমাধানের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। এমএএস/ইএ
বিজ্ঞাপন