বিজ্ঞাপন
নেত্রকোনা জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বন বিভাগের কার্যালয় চত্বর থেকে রেন্ট্রি, মেহগনিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে ছয়টি হ্যান্ডট্রলি ও ভ্যানভর্তি করে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, কাটা এসব গাছের বাজারমূল্য কয়েক লাখ টাকা হতে পারে। ঘটনার সময় একটি কাঠবোঝাই গাড়ি স্থানীয় জনতা আটক করে পুলিশে খবর দেয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে গাড়িসহ চালককে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
এ ঘটনায় সরকারি বন বিভাগের কার্যালয় থেকেই গাছ কেটে রাতের আঁধারে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বন বিভাগের কার্যালয় চত্বর থেকে দিনভর রেন্ট্রি, মেহগনিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কাটা হয়। পরে কাটা গাছগুলো ছয়টি হ্যান্ডট্রলি ও ভ্যানে তুলে রাতের আঁধারে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এ সময় বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে এলে তারা গাড়িতে থাকা ব্যক্তিদের কাছে গাছ কাটার অনুমতি এবং কাঠ পরিবহনের বৈধ কাগজপত্র দেখতে চান। তবে সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে সন্তোষজনক কোনো জবাব দিতে পারেননি বলে দাবি করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিস্থিতি সামাল দিতে বন বিভাগের স্পিডবোট চালক ইন্দ্রজিত ঘটনাটি মীমাংসার চেষ্টা করেন। পরে তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সাংবাদিকরা সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, কিছু ডালপালা কেটে বিক্রির উদ্দেশ্যে গাড়িতে তোলা হয়েছে। তবে সাংবাদিকরা গাড়িতে ডালপালার পাশাপাশি বড় গাছের গুঁড়িও রয়েছে বলে জানালে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একপর্যায়ে ওই কর্মকর্তা গাছ কাটার বিষয়টি স্বীকার করেন বলে সাংবাদিকদের দাবি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, পরে ইন্দ্রজিতের সহায়তায় পাঁচটি কাঠবোঝাই গাড়ি বন বিভাগের কার্যালয় থেকে বেরিয়ে যায়। তবে একটি কাঠবোঝাই গাড়ি স্থানীয় জনতা সড়কে আটক করে রাখে। খবর পেয়ে নেত্রকোনা মডেল থানার এসআই মুনসুরের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। পরে পুলিশ গাড়িসহ চালক রুবেল মিয়া (৩০)কে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। আটক রুবেল মিয়া বারহাট্টা উপজেলার পটুয়াকান্দা (দেউলি) গ্রামের দুলাল মিয়ার ছেলে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আটক গাড়ির চালক রুবেল মিয়া এবং বন বিভাগে কর্মরত ইন্দ্রজিত একই গ্রামের বাসিন্দা। এ ছাড়া কাঠ ব্যবসায়ী ফারুকসহ আরও কয়েকজনের বাড়িও একই এলাকায় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কর্তনকৃত গাছগুলো বন বিভাগের হেফাজতে সংরক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সরকারি গাছ কাটার অনুমতি ছিল কি? বন বিভাগের কার্যালয় চত্বর থেকে কয়েক যুগের পুরোনো মেহগনিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কাটার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তাদের প্রশ্ন, সরকারি জায়গার এসব গাছ কাটতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না? অনুমোদন থাকলে সেই নথি কোথায়? কী কারণে গাছগুলো কাটা হয়েছে? কাটা কাঠ কোথায় নেওয়া হচ্ছিল এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত? স্থানীয়দের আরও প্রশ্ন, কোনো ধরনের বৈধ অনুমোদন না থাকলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের চত্বর থেকে দিনের পর দিন গাছ কেটে রাতের আঁধারে তা পরিবহনের সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো? নেত্রকোনা শহরের প্রাণকেন্দ্রে বন বিভাগের নিজস্ব কার্যালয় থেকে গাছ কাটার অভিযোগ ওঠায় স্থানীয়দের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
তাদের ভাষ্য, বন বিভাগের কার্যালয় চত্বরেই যদি সরকারি গাছ ও বনসম্পদ নিরাপদ না থাকে, তাহলে দুর্গম মফস্বল ও সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলের মূল্যবান বনসম্পদ কতটা নিরাপদ—সেটিও প্রশ্নের বিষয়। স্থানীয়রা ঘটনার নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেছেন। একই সঙ্গে গাছ কাটার অনুমোদন, সরকারি সম্পদের মালিকানা, কাঠ পরিবহনের বৈধতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ব্যবসায়ীদের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি স্থানীয়দের।
তাদের মতে, সরকার যখন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও বৃক্ষরোপণে ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন সরকারি প্রতিষ্ঠানের চত্বরে থাকা পুরোনো গাছ যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া কাটা ও বিক্রির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। তাই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উদঘাটন জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
বিজ্ঞাপন