বিজ্ঞাপন
পুরান ঢাকার অলিগলিতে মানুষের সঙ্গে প্রাণীদের সহাবস্থান নতুন কোনো গল্প নয়। কিন্তু কখনো কখনো কোনো একটি প্রাণী শুধু একটি গলির বাসিন্দা হয়ে থাকে না, ধীরে ধীরে সে হয়ে ওঠে সেই এলাকার স্মৃতি, পরিচিত মুখ, এমনকি পরিবারেরই একজন। লালবাগ রোডের বিজিবি ২ নম্বর গেট এলাকার ‘টমি’ ছিল তেমনই এক কুকুর।
কোনো নির্দিষ্ট বাড়ির পোষা ছিল না সে। তবু এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এলাকার মানুষের ভালোবাসায় বেড়ে ওঠা টমি হয়ে উঠেছিল সবার আপন।
টিউমারে আক্রান্ত হয়ে সম্প্রতি মারা গেছে টমি। আর তার মৃত্যুর পরই যেন বোঝা গেল, একটি প্রাণীকে ঘিরে একটি মহল্লার মানুষের কতটা গভীর আবেগ তৈরি হতে পারে। টমির ছবি দিয়ে এলাকায় টাঙানো হয়েছে শোকবার্তা ও অবিচুয়ারি ব্যানার।
সেখানে তাকে বর্ণনা করা হয়েছে ‘প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বের অধিকারী ও শান্ত প্রকৃতির’ হিসেবে। কোনো মানুষের মৃত্যুর পর যেমন প্রিয়জনেরা স্মৃতি ধরে রাখতে শোকবার্তা দেন, টমির ক্ষেত্রেও তেমন দৃশ্যই দেখা গেছে লালবাগের গলিতে।
টমির গল্প অবশ্য শুরু হয়েছিল আরও অনেক আগে। মাত্র ১৫ দিন বয়সে তাকে নিয়ে এসেছিলেন নাজিমুদ্দিন। ছোট প্রাণীটিকে স্নেহ-যত্নে বড় করে তুলেছিলেন তিনি। সময়ের সঙ্গে টমি শুধু বড় হয়নি, তৈরি হয়েছিল মানুষের সঙ্গে তার এক অদ্ভুত বন্ধন।নাজিমুদ্দিনের কাছে সে হয়ে উঠেছিল পরিবারের একজন।
পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে যেমন চিকিৎসার জন্য ছুটে যাওয়া হয়, টমির ক্ষেত্রেও কোনো কমতি ছিল না। তার অসুস্থতা, খাবার, অভিমান-সবকিছুই গুরুত্ব পেত পরিবারের অন্য সদস্যদের মতো। ফলে টমির মৃত্যু নাজিমুদ্দিনের কাছে শুধু একটি পোষা প্রাণী হারানোর ঘটনা ছিল না, হারিয়েছেন দীর্ঘদিনের এক সঙ্গীকে।
টমির সঙ্গে নাজিমুদ্দিনের সম্পর্কের সবচেয়ে মিষ্টি দিক ছিল তাদের মান-অভিমান। নাজিমুদ্দিন কোনো কারণে টমিকে গুরুত্ব না দিয়ে পাশ কাটিয়ে গেলে সে অভিমান করত। এমনকি অভিমানে খাবার পর্যন্ত মুখে তুলত না। প্রথমবার খাবার দেওয়া হলো, টমি উঠল না। দ্বিতীয়বারও একই অবস্থা। দূরে গিয়ে বসে থাকত সে।
শেষ পর্যন্ত নাজিমুদ্দিন যখন তৃতীয়বার কাছে গিয়ে আদর করে বলতেন, ‘মামা খাও, ভুল হয়ে গেছে মামা’, তখন যেন বরফ গলত। টমি ধীরে ধীরে খাবার খেতে শুরু করত। মানুষের সঙ্গে একটি প্রাণীর এমন সম্পর্ক যে কতটা গভীর হতে পারে, টমির এই ছোট অভিমানেই তার প্রমাণ মিলত।
তবে টমি শুধু নাজিমুদ্দিনের কুকুর ছিল না। পুরো এলাকার মানুষের সঙ্গেই তার ছিল আলাদা সম্পর্ক। কেউ তাকে ডাকতেন ‘রাজা’। এলাকার হাজারো মানুষের কাছে সে ছিল পরিচিত মুখ। দোকান থেকে গলি, রাস্তার মোড় থেকে পরিচিত বাড়ির সামনে-সব জায়গাতেই ছিল তার অবাধ যাতায়াত।
টমির কিছু নিজস্ব পছন্দও ছিল। কেউ তাকে ডাকলে সে অনেক সময় সোজা দোকানের সামনে গিয়ে হাজির হতো। কেউ বিস্কুট দিলে মাটিতে ফেলে রাখলে খেত না। কোনো কিছুর ওপর সুন্দর করে তুলে দিলে তবেই খাবার গ্রহণ করত। অনেকেই তাকে নিজের হাতে খাইয়ে দিতেন। অর্থাৎ টমিও যেন বুঝে গিয়েছিল, এই মহল্লায় সে একা নয়; তাকে ঘিরে আছে অসংখ্য আপন মানুষ।
আরও পড়ুন
মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে শাড়ি-স্যান্ডেল পরে ম্যারাথনে মা
আজ সেই মানুষগুলোর কাছেই টমির অনুপস্থিতি বড় শূন্যতা। যে গলিতে তাকে প্রতিদিন দেখা যেত, সেখানে এখন তার স্মৃতিই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। দোকানের সামনে হয়তো কেউ তাকে ডাকছেন না, খাবার দেওয়ার জন্য কেউ অপেক্ষা করছেন না। কিন্তু দেয়ালে টাঙানো তার ছবিগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছে-এই গলির গল্পে টমিরও একটি বড় অধ্যায় ছিল।
প্রাণীদের প্রতি মানুষের আচরণ নিয়ে যখন নানা প্রশ্ন ওঠে, তখন লালবাগের এই ঘটনা নিঃসন্দেহে অন্যরকম একটি ছবি দেখায়। একটি বেওয়ারিশ কুকুরকে শুধু রাস্তার প্রাণী হিসেবে না দেখে মানুষ যে আপন করে নিতে পারে, তারও একটি সুন্দর উদাহরণ তৈরি করেছে টমির জীবন।
আরও পড়ুন
পুরোনো গাড়ির ব্যবসার একাল-সেকাল দেখেছেন ৭০ বছরের শহীদ
টমির গল্প তাই শুধু একটি কুকুরের মৃত্যুর গল্প নয়। এটি মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে তৈরি হওয়া নিঃশব্দ সম্পর্কের গল্প। এমন এক সম্পর্ক, যেখানে কোনো রক্তের বন্ধন নেই, নেই একই ঘরের ঠিকানা-তবু আছে দীর্ঘদিনের পরিচয়, মায়া, অভিমান আর ভালোবাসা।
সূত্র: সোশ্যাল মিডিয়া
এসএকেওয়াই
বিজ্ঞাপন