বিজ্ঞাপন
ভারতে ‘গদি মিডিয়া’ বলে একটি শব্দ চালু হয়েছে এবং দেশটির অধিকাংশ গণমাধ্যমই শাসকের অনুগত হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
রোববার (৩০ আগস্ট) পিআইবির অডিটরিয়ামে সাংবাদিক আবদুস সালাম স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
পিআইবির প্রতিষ্ঠাতা মহাপরিচালক এবং পাকিস্তান অবজারভার ও বাংলাদেশ অবজারভারের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও ভাষাসৈনিক আবদুস সালামের ১১৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এ সভার আয়োজন করা হয়।
সভায় গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গে নোম চমস্কির বক্তব্য উল্লেখ করে রিজভী বলেন, স্বৈরাচারী শাসনে জনগণকে দমন করার জন্য যেমন লাঠি ব্যবহার করা হয়, তেমনি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বৈরাচারী মানসিকতার শাসকেরা গণমাধ্যমকে সেই লাঠির মতো ব্যবহার করতে পারেন।
ভারতের গণমাধ্যমের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে ‘গদি মিডিয়া’ বলে একটি শব্দ চালু হয়েছে। অধিকাংশ গণমাধ্যমই শাসকের অনুগত হয়ে পড়েছে। অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশেও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা বাড়ছে।
আরও পড়ুন
ফ্যাসিজম সমর্থনকারী গণমাধ্যম বয়কটের আহ্বান তথ্যমন্ত্রীর
রিজভী বলেন, যারা প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, তারা শুধু রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতায় নয়, মানুষের স্বাধীনতা ও নাগরিক স্বাধীনতায়ও বিশ্বাস করেন। আর এ ধরনের স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ সবসময়ই নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।
সাংবাদিক আবদুস সালামকে এমনই একজন স্বাধীনচেতা মানুষ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি কোনো ক্ষমতা, হুমকি কিংবা স্বার্থের কাছে মাথানত করেননি।
আবদুস সালামের শিক্ষাজীবনের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, ওই সময়ে একজন বাঙালি মুসলমান হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা এবং প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করে পাস করা ছিল উল্লেখযোগ্য বিষয়। তিনি প্রথমে ভালো বেতনের সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। পরে সেই চাকরি ছেড়ে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন।
রিজভী বলেন, শিক্ষিত মানুষের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করার যে ধারণা তিনি একটি উপন্যাসে পড়েছিলেন, আবদুস সালামের জীবন তারই বাস্তব উদাহরণ। লাভজনক সরকারি চাকরি ছেড়ে সাংবাদিকতায় আসা ছিল তার আদর্শ ও স্বাধীনচেতা মানসিকতার প্রকাশ।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে আবদুস সালামের জীবনের নানা মিলের কথাও তুলে ধরেন রিজভী। তিনি বলেন, নজরুল কবির পাশাপাশি সাংবাদিকও ছিলেন। দুজনই তাদের লেখনীর কারণে কারাবরণ করেছেন এবং নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। ১৯৭৬ সালে দুজনই একুশে পদকে ভূষিত হন।
ভাষা আন্দোলনের সময় আবদুস সালামের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে রিজভী বলেন, পাকিস্তান আমলে ভাষা আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণেও তাকে গ্রেফতার হতে হয়েছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি একটি কলামে ভাষার পক্ষে কথা বলেছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে ধর্মবিরোধী আখ্যা দিয়ে গ্রেফতার করা হয়।
পরে আবদুস সালাম রাজনীতিতেও যুক্ত হন বলে জানান রিজভী। যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে সংসদ সদস্য হওয়ার পরও সাংবাদিকতার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। বিভিন্ন সময়ে চাকরি করে সংসার চালানোর পাশাপাশি তিনি আবার ‘অবজারভার’-এ কাজ করতেন।
আইয়ুব খানের লেখা ‘Friends Not Masters’ বইয়ের সমালোচনার ঘটনাও তুলে ধরেন রিজভী। তিনি বলেন, ওই বইয়ের কঠোর সমালোচনা করে আবদুস সালাম ‘অবজারভার’-এ লেখা প্রকাশ করেন। এর পরদিনই পত্রিকাটি বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। মৃদু গণতন্ত্র থাকলেও, ফ্যাসিবাদ থাকলেও, সামরিক শাসনতন্ত্র থাকলেও—তার ওপর আক্রমণ হয়েছে।
আরও পড়ুন
জহির উদ্দিন স্বপন / আমি আশাবাদী, বর্তমান তথ্যমন্ত্রী অত্যন্ত যোগ্য মানুষ
আবদুস সালামকে শুধু সাংবাদিক নয়, একজন ‘অ্যাক্টিভিস্ট সাংবাদিক’ হিসেবে উল্লেখ করেন রিজভী। তার ভাষ্য, সাংবাদিকতা শুধু ডেস্কে বসে লেখালেখির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমাজ ও রাষ্ট্র যখন বিপদের মুখে পড়ে, তখন একজন বিবেকবান ও শিক্ষিত মানুষের দায়িত্ব হলো সেই বিপদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। আবদুস সালাম সেই দায়িত্ব থেকে কখনো বিচ্যুত হননি।
রিজভী আরও বলেন, স্বাধীনচেতা ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার কারণে আবদুস সালাম শুধু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেই নয়, পাকিস্তানের প্রেস কাউন্সিলের সভাপতির দায়িত্বও পেয়েছিলেন। তার সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য ছিল বস্তুনিষ্ঠতা ও স্বাধীনতা।
আবদুস সালামের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের অজ্ঞতার বিষয়েও আক্ষেপ করেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, এত বড় মাপের একজন সাংবাদিক সম্পর্কে এখন যত বেশি জানা যাচ্ছে, ততই মনে হচ্ছে তিনি যেন ইতিহাসের যবনিকার আড়ালে চলে গেছেন। নতুন প্রজন্মের অনেকেই তার সম্পর্কে জানে না।
রিজভী বলেন, আবদুস সালামের সময়ে সংবাদপত্রের মালিকপক্ষ রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমত পোষণ করলেও সাংবাদিকের স্বাধীনতায় সব সময় হস্তক্ষেপ করত না। সেসময় সাংবাদিকতার একটি মানদণ্ড ছিল। মালিকপক্ষের রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হলেও সাংবাদিক তার স্বাধীন মতপ্রকাশ করতে পারতেন।
বর্তমান সময়ের সাংবাদিকতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, লাভজনক সরকারি চাকরি ছেড়ে সাংবাদিকতা পেশায় আসার মতো দৃষ্টান্ত এখন খুবই কম। তরুণদের অনেকেই সাংবাদিকতার চেয়ে প্রশাসন বা পুলিশ ক্যাডারকে বেশি আকর্ষণীয় মনে করেন। ফলে আবদুস সালামের মতো আদর্শ সাংবাদিকের জীবন বর্তমান প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, একসময় সাংবাদিকেরা সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশকে তাদের দায়িত্ব মনে করতেন। অর্থ, হুমকি কিংবা ক্ষমতার কাছে তারা মাথানত করতেন না। আবদুস সালাম ছিলেন সেই সাংবাদিকতার প্রতীক।
তিনি আরও বলেন, আমরা তো গণতন্ত্রের কথা বলি। যখন খানিকটা দুর্বল গণতন্ত্র থাকে, তখনো যারা প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন—সে স্বাধীনতা শুধু রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা নয়, মানুষের স্বাধীনতা, নাগরিক স্বাধীনতা—তারা সব সময় নিপীড়িত হয়েছেন।
পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ ও বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক লোটন একরামের সঞ্চালনায় সভায় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার এবং সাংস্কৃতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান, ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালামসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
কেএইচ/ইএ
বিজ্ঞাপন