বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত এক চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেট। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সর্বসাম্প্রতিক তথ্য সহজে সবার কাছে পৌঁছে দিতে তাদের আছে একটি উন্মুক্ত অনলাইন জার্নাল ই-ক্লিনিক্যাল মেডিসিন। এই সাময়িকীতেই ৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশি চিকিৎসক ও গবেষক ডা. ফরহাদ উদ্দিন হাসান চৌধুরীর একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। সংক্ষেপে গবেষণাটির নাম ‘প্রোক্যালবান’। কী নিয়ে এই গবেষণা, দেশের মানুষেরই–বা কী কাজে আসবে, জানতে এই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেছেন রাফিয়া আলম
‘ই-ক্লিনিক্যাল মেডিসিনে’ আপনার যে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে, তার বিষয়বস্তু কী?
সহজভাবে বলতে গেলে, সেপসিস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের সময়কাল কমিয়ে আনতে একটি ‘সাধারণ রক্ত পরীক্ষা’ কতটা সহায়ক, তা নিয়েই এ গবেষণা। এই ‘সাধারণ পরীক্ষা’র মাধ্যমে রক্তে প্রোক্যালসিটোনিন নামের একটি ‘মার্কার’-এর মাত্রা দেখা হয়। ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে যার মাত্রা বাড়ে; সংক্রমণ কমে আসছে কি না, তা-ও বোঝা যায়। তখন অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
অ্যান্টিবায়োটিক যত বেশি সময়ের জন্য দেওয়া হয়, ততই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়ে। অনেক সময় বিভিন্ন জীবাণু অ্যান্টিবায়োটিক-রেজিস্ট্যান্ট (অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী) হয়ে ওঠার সুযোগ পায়। চিকিৎসার ব্যয়ও বাড়ে। এসব অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের মোট সময়কাল কমিয়ে আনার প্রচেষ্টা হিসেবে এই গবেষণার শুরু।
সেপসিস কী? কতটা গুরুতর?
গুরুতর সংক্রমণ হলে দেহে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। যে কারণে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা এমনভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা নিজ দেহের জন্যই ক্ষতিকর। এ কারণে দেহের কোনো অঙ্গ বিকল হতে শুরু করে। এই অবস্থার নাম সেপসিস। সাধারণভাবে একে ‘রক্তে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া’ বলে।
সেপসিসে আক্রান্ত রোগীর নানান শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও থাকে। সেপসিসে আক্রান্ত রোগীদের সুস্থতার জন্য আমাদের দেশে একটা লম্বা সময় অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়।
সংক্রামক রোগ নিয়ে আলাদাভাবে কাজ করার কারণটা জানতে চাই।
সংক্রামক ব্যাধি নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা ছিল আগে থেকেই। ইন্টারনাল মেডিসিনে এফসিপিএস ডিগ্রি অর্জনের পর আমি কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে লিভারপুল স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনে পড়তে যাই। সেখানে ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজে মাস্টার্স করি।
দেশে ফেরার পর ২০১৯ সালে ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব এবং এরপর কোভিড অতিমারির সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজে সেবা দিই। কোভিড-১৯ চিকিৎসাবিষয়ক জাতীয় নির্দেশনার সহলেখকও ছিলাম। ক্লিনিক্যাল এসব কাজের মধ্যেই আমার উপলব্ধি হয়, দেশে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ একটা ভয়াবহ পর্যায়ে চলে গেছে।
অধিকাংশ অ্যান্টিবায়োটিকে রেজিস্ট্যান্ট হয়ে যাওয়া জীবাণু এ দেশের চিকিৎসাসেবার এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। দেশের বহু জায়গায় মানসম্মত ল্যাবরেটরি না থাকার কারণে চিকিৎসকেরা শুধু ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা করেই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।
এবারকার গবেষণাকাজটি তো এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। পুরো বিষয়টা কীভাবে সামলেছেন?
যুক্তরাজ্যের কমনওয়েলথ স্কলারশিপ কমিশনের অর্থায়নে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লিনিক্যাল মেডিসিনে পিএইচডি করার সুযোগ পাই। তখন এমন একটি বিষয়ে গবেষণা করতে চাইলাম, যাতে সহজ একটি পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসকেরা কম সময়েই সেপসিস রোগীর অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
নানা দিক বিবেচনা করে রক্তের প্রোক্যালসিটোনিনের মাত্রার সঙ্গে বিষয়টির সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করার কথা ভাবলাম। এরপর আমার পিএইচডির প্রধান সুপারভাইজার অধ্যাপক আরিয়ান ডনডর্পের সঙ্গে আলাপ করলাম। আমি প্রধান গবেষক হলেও সব মিলিয়ে ৫৭ জনের একটি দল নিয়ে কাজ করেছি। পুরো গবেষণাকাজের বিশাল তহবিলের জোগান দিয়েছে যুক্তরাজ্যের ওয়েলকাম ট্রাস্ট।
দেশে-বিদেশে মোট তিনটি প্রতিষ্ঠান থেকে এথিক্যাল ক্লিয়ারেন্স (গবেষণার নৈতিক অনুমোদন) নিতে হয়েছে।
ক্লিনিক্যাল তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে কোথায়?
গবেষণার জন্য ক্লিনিক্যাল তথ্য সংগ্রহের কাজটি বাংলাদেশেই হয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ব্যাকটেরিয়াজনিত সেপসিস বা সম্ভাব্য সেপসিস রোগীদের নিয়ে। ২০২৩-২৪ সালে এমন রোগী পাওয়া গিয়েছিল এক হাজার দুইজন।
তবে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সব বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় রেখে শেষ পর্যন্ত ৫৩২ জনকে নিয়ে গবেষণাটি করা হয়। যেমন অন্তঃসত্ত্বা নারী, ১৬ বছরের কমবয়সী বা ৬৫ ঊর্ধ্ব রোগীদের এই গবেষণার অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
গবেষণার ফলাফল কী?
৫৩২ জন রোগীকে দৈবচয়নের মাধ্যমে দুটি দলে ভাগ করা হয়। একটি দলের চিকিৎসা হয়েছে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী। দেখা গেছে, তাদের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের মধ্যম সময় ছিল ৯ দিন। অন্য দলটির রক্তে প্রোক্যালসিটোনিনের মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়েছে। এই দলে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের মধ্যম সময় ছিল ৪ দশমিক ৭ দিন, যা প্রচলিত চিকিৎসার দলের প্রায় অর্ধেক। দুই দলের মধ্যে মৃত্যু বা আবার সংক্রমণের হারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
তাহলে তো বলা যায়, এসব ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের সময়সীমা বিষয়ে প্রোক্যালসিটোনিন ভালো একটি নির্দেশক?

গবেষণার ফলাফল থেকে তেমনটাই বলা যায়। তবে রক্তে প্রোক্যালসিটোনিন পরীক্ষার সুযোগ বাংলাদেশের অনেক হাসপাতালেই নেই। তা ছাড়া এই পরীক্ষার খরচও বেশি। আমাদের গবেষণায় আমরা নিজেদের উদ্যোগে প্রযুক্তিগত খরচটা কমানোর চেষ্টা করেছি। প্রতিবার প্রোক্যালসিটোনিন পরীক্ষার জন্য চার ডলারের মতো খরচ হয়েছে। তাই বলা যায়, চাইলে খরচ কমানো সম্ভব।
উন্নত দেশগুলোয় এর আগে এ ধরনের গবেষণা হয়েছে, যেখানে প্রয়োজনীয় পরিষেবা রয়েছে। কিন্তু গবেষণাটি বাংলাদেশের একটি সীমিত সুবিধাসম্পন্ন সরকারি হাসপাতাল থেকে উপাত্ত নিয়ে করা হয়েছে। এ দেশে সংক্রামক ব্যাধি এবং অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের মাত্রা অনেক বেশি। তাই এই গবেষণা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
প্রোক্যালসিটোনিন পরীক্ষা করলে রোগীর চিকিৎসার খরচ কি কমে?
আমাদের গবেষণায় প্রোক্যালসিটোনিন-নির্দেশিত দলে অ্যান্টিবায়োটিকের মধ্যম খরচ ছিল ৩৭ দশমিক ১ ডলার, আর প্রচলিত চিকিৎসার দলে ছিল ৪৫ দশমিক ৮ ডলার। অর্থাৎ অ্যান্টিবায়োটিকের খরচ কমেছে। তবে প্রোক্যালসিটোনিন পরীক্ষার খরচ যোগ করার পর মোট মধ্যম ব্যয় দাঁড়ায় ৫৩ দশমিক ১ ডলার, যা প্রচলিত চিকিৎসার দলের চেয়ে বেশি।
তবে এটি পূর্ণাঙ্গ ব্যয়সাশ্রয়ী বিশ্লেষণ ছিল না। রোগীর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যান্য খরচ, পরিবারের ব্যয়, কর্মক্ষমতা হারানো বা দীর্ঘ মেয়াদে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের কারণে সম্ভাব্য ব্যয় এতে ধরা হয়নি। তাই শুধু এই সংখ্যার ভিত্তিতে বলা যাবে না যে পদ্ধতিটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক বা অলাভজনক। বাংলাদেশে এটি বাস্তবে চালু করতে হলে সাশ্রয়ী মূল্যের প্রোক্যালসিটোনিন পরীক্ষা এবং পূর্ণাঙ্গ ব্যয়সাশ্রয়ী মূল্যায়ন প্রয়োজন।
গবেষণাটি থেকে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কী পাবে?
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রোক্যালসিটোনিন পরীক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব, খরচও কমানো সম্ভব। সাধারণ মানুষ তখন এই গবেষণার সুফল পাবে। দীর্ঘ মেয়াদে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের জটিলতাগুলো এড়ানো গেলে দেশের বিরাট আর্থিক বোঝা লাঘব হবে।
বাংলাদেশ যে কেবল আন্তর্জাতিক গবেষণার জন্য সাবজেক্টই (রোগী) দিতে পারে, তা নয়। বরং দেশের স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান করতে আন্তর্জাতিক পরিসরে ক্লিনিক্যাল এভিডেন্সও (প্রমাণ) উপস্থাপন করতে পারে। এ ধরনের স্বীকৃতির কারণে দেশের গবেষকদের আরও সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>